রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪

শিরোনাম

চবির অডিও কেলেঙ্কারি: প্রথম তদন্ত কমিটির শাস্তি দ্বিতীয় কমিটিতে বহাল, সিন্ডিকেটে ‘কাটছাঁট’

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২, ২০২৩

প্রিন্ট করুন

চবি প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত অডিও কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রথম তদন্ত কমিটি যে শাস্তির সুপারিশ করেছিল তা বহাল রেখেছে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির সুপারিশ পুরোপুরি আমলে নেয়নি। দ্বিতীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী কর্মচারী আহমদ হোসেনকে চাকরিচ্যুত করলেও উপাচার্যের তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনের শাস্তি শিথিল করেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও শিক্ষক নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ নথি হারানোর দায়ে উপাচার্য দপ্তরের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. সাহাবুদ্দিনকে সতর্ক করে উপাচার্যের দপ্তর থেকে বদলি ও অডিও কেলেঙ্কারির মূল হোতাকে বের করতে দুই অভিযুক্তকে আসামি করে একটি মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়।

মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৫ তম সিন্ডিকেট সভায় এই সংক্রান্ত বিষয়ে গঠিত দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত পাঁচটি ফোনালাপ ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া পাঁচটি ফোনালাপ ছিল উপাচার্য ড. শিরীণ আখতারের তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন ও হিসাব নিয়ামক দপ্তরের কর্মচারী আহমদ হোসেনের সঙ্গে দু’জন নিয়োগ প্রার্থীর। এর মধ্যে একটি ফোনালাপে প্রভাষক পদের এক প্রার্থীর সঙ্গে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারীকে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলতে শােনা যায়।

অপর একটি ফোনালাপে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলাের শীর্ষব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করতেই উপাচার্যের টাকার প্রয়ােজন বলে উল্লেখ করেছেন কর্মচারী আহমদ হোসেন।

এ ঘটনা তদন্তে একই বছর ৫ মার্চ ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে তদন্ত কমিটি চার মাস পর ০৬ জুলাই আট পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনকে পদাবনতি ও কর্মচারী আহমদ হোসেনকে চাকরিচ্যুত করা, মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে মামলা করাসহ পৃথক দশটি সুপারিশ করা হয়। পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা প্রতিবেদনটি সর্বসম্মতভাবে গ্রহন করে দুই কর্মচারীর শাস্তির বিষয়ে অধিকতর যাছাই বাছাই করে সুপারিশ করার জন্য আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গত ২৩ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয়।

দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে:

দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন চলমান নিউইয়র্কের হাতে এসেছে। সিন্ডিকেটে পেশকৃত পাঁচ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির প্রস্তাবসহ চারটি পর্যবেক্ষণ ও তিনটি সুপারিশ প্রদান করা হয়।

পর্যবেক্ষণে যা আছে:

প্রথম পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মচারী আহমদ হোসেনকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য একাধিকবার চিঠি পাঠানো ও টেলিফোন করা হলেও তিনি সাক্ষাৎকার দেননি। তদন্ত কমিটি আহমদ হোসেনের এই অসহযোগিতাকে আরও একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, চাকুরী প্রার্থীর সঙ্গে উপাচার্যের তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনের স্বতঃস্ফূর্ত ও অত্যন্ত আপত্তিকর, অযাচিত ও এখতিয়ার বহির্ভূত কথোপকথনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের মারাত্মক মর্যাদাহানি হয়েছে। এসব কথোপকনের কোন গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। ফোনালাপে খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন অসৎ উদ্দেশ্যে যেসব আপত্তিকর ও ঈঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন তা চবি সংবিধি ১২ এর ধারা ৩ (সি) অনুযাযী গুরুতর অসদাচরণ এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তার জন্য বেমানান। সুতরাং তাঁর কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন বলে কমিটি মনে করে। তাঁর এমন হঠকারী ও মানহানীকর আচরণের জন্য তাঁকে কোন স্পর্শকাতর দায়িত্বে রাখাও ঝুঁকিপুর্ণ বলে কমিটি মনে করে।

তৃতীয় পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের আবেদনকারীদের মূল আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরের মূল নোট সংক্রান্ত ফাইলটি উপাচার্য দপ্তরে না থাকার ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়। নির্বাচনী বোর্ড সভা সংক্রান্ত কাজ উপাচার্য দপ্তরের সহকারী রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিনের দায়িত্বাধীন। ফাইল হারানোর দায় মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিনসহ উপাচার্য দপ্তরে কর্মরত তৎকালীন অন্যান্য কর্মরর্তা/কর্মচারী কোনোভাবে এড়াতে পারেন না। এছাড়া এ সংক্রান্ত সকল তথ্য মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তদন্ত কমিটির কাছে পুরোপুরি গোপন করেছেন যা অবাধ্যতা ও অসহযোগিতা।

চতুর্থ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ৫৩৮ তম সিন্ডিকেট সভায় সিন্ডিকেট কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত (আহমেদ হোসেন ও খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করা) কার্যকর করা কাম্য ছিল বলে বর্তমান কমিটি মনে করে।

সুপারিশে যা আছে:

১. চাকুরীপ্রার্থীর সঙ্গে কথোপকথনে আহমদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও
রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ায় চবি সংবিধি ১২ এর ধারা ৪ এর ১(এফ) অনুযায়ী তাঁকে চাকুরীচ্যূতির জন্য গঠিত কমিটি সর্বসম্মতভাবে সুপারিশ করছে।

২. খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনের কর্মকাণ্ড গুরুতর অসদাচরণ হওয়ায় তাঁকে চবি সংবিধি ১২ এর ধারা ৪ এর ১(ডি) অনুযায়ী স্থায়ীভাবে (ভবিষ্যতে কোন
পদোন্নতি পাবেন না) দুই ধাপ পদাবনতি দিয়ে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক থেকে সেকশান অফিসার করার এবং অবিলম্বে প্রশাসনিক ভবনের বাইরে বদলীর জন্য গঠিত কমিটি সর্বসম্মতভাবে সুপারিশ করছে।

৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি চরমভাবে বিনষ্টকারী, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত তথা অর্থের বিনিময়ে চাকুরি প্রদানের অবৈধ প্রস্তাবকারী অসাধু চক্রটিকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বার্থে আহমদ হোসেন ও খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে জরুরী
ভিত্তিতে ফৌজদারী মামলা দায়ের করার জন্য সিন্ডিকেটের ৫৩৮ তম সভার সিদ্ধান্ত জরুরী ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্যও কমিটি সর্বসম্মতভাবে সুপারিশ করছে।

সিন্ডিকেটে যে সিদ্ধান্ত হলো:

দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোকে সিন্ডিকেট কর্মচারী আহমদ হোসেনের চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কর্মকর্তা খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনকে দুই ধাপ পদাবনতির পরিবর্তে এক ধাপ পদাবনতি ও অন্যত্র বদলির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে পদোন্নতি না দেওয়ার সুপারিশ বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে একটি মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিন্ডিকেট সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, সিন্ডিকেট তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে খালদে মিছবাহুল মোকর রবীনকে এক ধাপ পদাবনতি দিয়েছে। কর্মচারী আহমদ হোসেনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে একটি মামলা করবে।

তিনি আরও বলেন, উপাচার্য দপ্তরের শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় উপাচার্য দপ্তরের সহকারী রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সিন্ডিকেট থেকে সর্বসম্মতিক্রমে সতর্ক করাসহ উপাচার্য দপ্তর থেকে দ্রুত বদলির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সিএন/এমটি

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন