রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪

শিরোনাম

দুর্গম পাহাড় ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্পে পরিপূর্ণ ভারতের পশ্চিম সিকিম!

রবিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৩

প্রিন্ট করুন

অভ্র বড়ুয়া, সিকিম, ভারত: পৃথিবীর মানচিত্র সবাই দেখেছে। কিন্তু, বিশ্ব তাকে দেখেছে, যে পুরো পৃথিবী দেখেছে। ভ্রমণপিপাসুরা ভ্রমণের মূল্য বুঝেন। স্বাস্থ্যগত, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিকাশে ভ্রমণ করা জরুরি। জীবনে নান্দনিকতা ছোয়া পেতে ঘুরে বেড়ান পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। আজ রোমাঞ্চকর ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ভারতে পশ্চিম সিকিমের গল্প শোনাব।

পাহাড় ঘেরা সিকিম রাজ্যটি ১৭ শতকে নামগিয়াল রাজবংশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়।রাজ্যটি মূলত চোগিয়াল নামে পরিচিত ছিল। একজন বৌদ্ধ পুরোহিত রাজা দ্বারা শাসিত ছিল। ১৮৯০ সালে এটি ব্রিটিশ ভারতের অধীনে একটি জমকালো রাজ্য হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের পরে সিকিম ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অঙ্গরাজ্য হিসাবে ছিল।

দার্জিলিং লেখাপড়া করার সুবাদে এই প্রথম আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে পশ্চিম সিকিম ভ্রমণের সুযোগ হয়। ভ্রমণ বললে ভুল হবে, মূলত দুর্গম পর্বত পদচারণা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমাদের ভ্রমণটি পাঁচ দিনের তালিকা অনুসারে সাজানো হয়।
প্রথম দিন-শিলিগুড়ি-পেলিং, দ্বিতীয় দিন-পেলিং থেকে খেচিপেরি, তৃতীয় দিন-খেচিপেরি থেকে ইয়াকসাম, চতুর্থ দিন ইয়াকসামের সবচেয়ে পুরনো প্রাচীন মন্দির দুবদি মনেস্ট্রি, পঞ্চম দিন (শেষ দিন) ইয়াকসাম থেকে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্য যাত্রা।

২৭ তারিখ আমরা ৪৫ জনের দল ও শিক্ষকরাসহ শিলিগুড়ি থেকে পেলিংয়ের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম দুটা গাড়িযোগে। মূলত ১২৪ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে আনুমানিক ৫-৬ ঘন্টা। কিন্তু, সিকিমে ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসে বির্পযস্ত হয় যানবাহন চলাচলের রাস্তা। তাই, আমরা কালিম্পং হয়ে দার্জিলিং ঘুরে পেলিং পৌঁছাই।১২ ঘন্টা সময় পেরিয়ে অবশেষে আমরা পেলিং পৌঁছাই। সেখানে আমাদের সাথে যুক্ত হয় অভিজ্ঞ শেরপার দল। শেরপা দলের প্রধান ছিলেন রূপেশ।

পশ্চিম সিকিম সবচেয়ে পরিচিত হিল স্টেশন হলেও নীল আকাশে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘার নৈসর্গিক শোভা দেখার জন্য। পেলিং পর্যটকদের পছন্দের স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম; যা ছয় হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পেলিংয়ের দর্শনীয় স্থানগুলো হল সাঙ্গাচোলিং চেনরেজিগ ট্যুরিজমপার্ক, স্কাইওয়াক, সাঙ্গাচোলিং মোনাস্ট্রি, ছাঙ্গে জলপ্রপাত, রিম্বিক জলপ্রপাত, রক গার্ডেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত ও খেচেওপালরি লেক।

খুব সহজে আপনি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে পুরো গাড়ি রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা। শিলিগুড়ি এসএনটি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসও ছাড়ে পেলিংয়ের, সকাল সাড়ে দশটায়। ভাড়া মাথাপিছু ১৮০ টাকা। শিলিগুড়ি এসএনটি থেকে অল্প কিছু দূরে গেজিংয়ের শেয়ার জিপও ছাড়ে, ভাড়া মাথাপিছু ৩০০ টাকা। দিনের শুরুর দিকে রওনা দিন পেলিংয়ের উদ্দেশে, তাহলে সহজেই সূর্যের আলো থাকতে পৌঁছে যেতো পারবেন পেলিং। তবে, রিজার্ভ গাড়ি নেয়াটাই ভাল।

দুর্ভাগ্যবশত আমরা পেলিংয়ে শুধু রাত্রিযাপন করেই পর দিন সকালে হোমস্টে থেকে সকালের খাবার খেয়ে ৪৫ জনের দল পায়ে হেঁটে খেচেওপালরির উদ্দেশ্য রওনা দিই।দুর্গম পাহাড়ি পথে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে সাথী করে ২০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিই আমরা। দারাপ, সিঙ্গইয়াং, সিন্দদ্রাং পেরিয়ে আমরা খেচওপালরি লেকে এসে উপস্থিত হই এবং সূর্য অস্ত যায়। তখনো গহীন অরণ্য পাহাড়ের কোলে অবস্থিত হোমস্টেতে আমরা পৌঁছাইনি। শেরপাদের সহযোগিতায় ৪৫ জনের দল মাথায় টর্চ লাগিয়ে নিবিড় অন্ধকারে পথ পাড়ি দিতি শুরু করি। ক্লান্ত শরীরে দেড় ঘন্টা পর আমরা দেড় হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছাই।

মৌজা খুলতেই আমাদের প্রায় অধিকাংশের পায়ে জোঁক। নিশ্চিন্তে রক্ত চুষে তারা মারা গেছেন। শেরপারা মজা করে বলছিলেন, যার পায়ে যত বেশি জোঁক, তার ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমি গুণে গুণে সাতটা জোঁক পেয়েছি। ক্লান্ত শরীরে ডাল, মুরগির মাংস, পেঁপে ভর্তা খেয়ে দিলাম ঘুম। যত রাত হচ্ছে, তত যেন তাপমাত্রা কমছে। তবে, ভাগ্য ভাল ছিল আমাদের আমরা সুবিধাজনক তাপমাত্রা পেয়েছি এবং বৃষ্টিও তেমন পাই নিই। তবে, যেহেতু আমরা বেশিরভাগ পথ পাহাড়ে ভ্রমণ করেছি, প্রতি কিলোমিটারে আমরা পাহাড় ধসের ক্ষয়ক্ষতির বিধ্বংসী আচরণ লক্ষ্য করেছি।

তবে, সিকিমের মানুষদের অতিথ্যের কোন তুলনা হয় না। যেমন সরল তারা, তেমন সৎ। মুখে সব সময় মিষ্টি হাসি তাদের। ভীষণ যত্ন ও ভালবাসায় আগলে রেখেছিলেন আমাদের পাহাড়ের মানুষেরা। অবাক করা বিষয়, পেলিং থেকে ইয়াকসাম পর্যন্ত ৩-৪টি কুকুর আমাদের সাথে পুরো পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। কুকুররা সত্যিই ভীষণ প্রভুভক্ত। এটাই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ বটে।

পর দিন ফের নতুন প্রত্যয় ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে রওনা দিলাম ইয়াকসামের উদ্দেশ্য।
সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল ২০ কিলোমিটারের পাহাড়ি পথটা। ঢালু পাহাড় আর খাঁদ।কিন্তু, শেরপাদের সহযোগিতা আর আমাদের সাহসিকতা নিরাপত্তা কর্মীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। গহীন পাহাড় বেয়ে আমরা যখন বিভিন্ন রাস্তায় এসে একত্রিত হচ্ছিলাম।তখন স্থানীয়রা সাহসীর দল বলে সম্বোধন করেছেন আমাদের। মেয়েদের জন্য পথটা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। কখনো তারা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ছে, কখনো তাদের ব্যাগ নিয়ে আমরা হাঁটছি। তবে, তারা একেবারের জন্যও গাড়িতে উঠতে সম্মতি জানায় নি।চ্যালেঞ্জ নিতে সবাই প্রস্তুত ছিল। আমাদের অধ্যক্ষ এত বয়স হওয়ার পরও নিরবিচ্ছিন্নভাবে পাহাড়ি পথ জয় করেছেন, যা চোখে পড়ার মত ছিল। বয়স তো সংখ্যা মাত্র। বয়স অদম্য ইচ্ছ ও সাহসের কাছে কিছু নয়।

সিকিমের অনন্য সুন্দর দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত। ভ্রমণপ্রেমীরা এখানে এসে এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। অনন্য সুন্দর এই জলপ্রপাতের জল পড়ার শব্দে মন জুড়ায় দর্শনার্থীদের। যা ইয়াসাম যাওয়ার পথে চোখে পড়বে।

অবশেষে সন্ধ্যা ছয়টায় আমরা ইয়াকসাম পৌঁছাই। পেলিং থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ইয়াকসাম সমুদ্রতল থেকে পাঁচ হাজার ৮৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পাহাড়ে ঘেরা এই শহর কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্কের মাথায় অবস্থিত। এলাকার মোট জনসংখ্যা চার হাজার ১৩।

ইয়াকসাম কথার অর্থ ‘তিন সাধুর সাক্ষাতের স্থান’’। কথিত আছে, তিব্বত থেকে আসা তিন বৌদ্ধ সাধু ফুন্টসোং নামগায়ালকে সিকিমের প্রথম রাজা বলে মান্যতা দিয়েছিলেন। ১৬৪১ সালে ওই শাসককে চোগিয়াল বা ধর্মীয় রাজার উপাধি দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে ৩৩৩ বছর সিকিমে চোগিয়াল বংশ রাজত্ব করেছে বলে শোনা যায়। আজো রয়েছে তার নিদর্শন। ইয়াকসাম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘামুখী ট্রেক শুরু করেন বহু পর্বোতারোহী। ইয়াকসাম এ দর্শন করতে পারেন ইতিহাস সমৃদ্ধ রাজবাড়ী।

শেষ দিন আমরা দর্শন করি দুবদি মঠ; যা নরবুগাং চোরটেং, পেমায়ংটসে মঠ, রাবডেন্টসে ধ্বংসাবশেষ। যা বৌদ্ধ তীর্থযাত্রার অংশ। ১৭০১ সালে প্রতিষ্ঠিত, এটিকে সিকিমের প্রাচীনতম মঠ বলে দাবি করা হয় এবং এটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। যা ইউকসোম থেকে প্রায় এক ঘন্টার পথ তিন কিলোমিটার। শেষ দিন সকলে মোমো, পনির থুকপা, লাচ্ছি, তিব্বতী রুটি, ইয়াক পনির মত সুস্বাদুকর স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিই।

পর দিন সকালে হাজারো সুন্দর স্মৃতি, আনন্দ নিয়ে আমরা শিলিগুড়ি ফিরি একই গাড়িতে করে।

শেরপা বলছিলেন, আমরা পশ্চিম সিকিমের অধিকাংশ পাহাড় সাহসিকতার সাথে শুধুমাত্র পার করি নাই, জয় করেছি। যা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক। তবে, আমরা সব সাবধানতার সাথে করেছি। পাঁচ দিনে মোট আমরা শুধুমাত্র পায়ে হেঁটে ৫৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছি। যা চ্যালেঞ্জিং ছিল বটে। কয়েক বোতল মুভ স্প্রে নিমিষে শেষ করেছি, পায়ের ব্যাথা কমাতে।

সাধারণত, পুরো এক সপ্তাহের ভ্রমণে দশজনের একটি দল সিকিমের সৌন্দর্য উপভোগ করতে মাথাপিছু খরচ হয় মাত্র ১২-১৩ হাজার টাকা!

বাংলাদেশীরা যা করবেন: সিকিম ভ্রমণের পূর্বে; দশ কপি করে পাসপোর্ট, ভিসা ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে নেবেন। রাংপোতে আসা-যাওয়ার পথে সিল অ্যারাইভ ও ডিপারচার করিয়ে নিতে হবে। নয়তো ভিসা জটিলতায় পড়তে পারেন। সিকিমের আইন ভীষণ কঠোর। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে যাবেন।গরম কাপড় নিয়ে নেবেন। বাংলাদেশীরা ট্রেনে বা বাসে প্রথমে পঞ্চগড় যাবেন। ওখানে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে জিপ ভাড়া করে শিলিগুড়ি যাবেন। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার। এছাড়াও, আপনারা সিলেট স্থলবন্দর দিয়েও সরাসরি যেতে পারেন।

সিকিমের নৈসর্গিক এই যাত্রাটা জীবনের অন্যতম স্মৃতিময় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। কারন, এটাই ভারতে আমার শিক্ষা জীবনের সমাপনী যাত্রার অন্যতম অংশ।
তাহলে, আর অপেক্ষা কেন চলুন একসাথে বলি, ‘পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়েঃ, বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’

আমি নিশ্চিত আপনার পরবর্তী ভ্রমণে সিকিমকে বেঁছে নেবেন।

লেখক: ভারতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী

সিএন/এমএ

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন