শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪

শিরোনাম

পাল্টাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক হাওয়া, নবীনদের চোখে অন্যরকম রাজপথ 

রবিবার, ডিসেম্বর ১১, ২০২২

প্রিন্ট করুন

ইফতেখার ইসলাম: একটা সময় ছিলো যখন রাজনীতি নিয়ে হতো উৎসব। ভোট এলে পাড়ার দোকানে দোকানে পড়ে যেতো আড্ডার রোল। মাঠে মাঠে সমাবেশ, প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত হয়ে যেতেন নেতাকর্মীরা। আমজনতার দ্বারে দ্বারে গিয়ে গা ঘেঁষতেন প্রার্থীরা। তবে বিগত কয়েক বছরে যেন হারিয়েই গেছে ভোটের সেই আমেজ। লোক দেখানো প্রচার প্রচারণা থাকলেও তা নিছক নাটকীয়। আর বিরোধী দলীয় প্রার্থীকে তো একেবারেই ‘এক ঘরে’ করে রাখার মতো। বিরোধী দলের সমাবেশ, প্রচার প্রচারণা কিংবা ভোট দেওয়াও যেন নিষিদ্ধের মতো হয়ে পড়েছে। এখনে ভোট যেন কেবলই নিয়ম রক্ষার কাজ। তবে সম্প্রতি পাল্টাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ফিরে আসছে পুরোনো সেই আমেজ। 

২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাস—বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তখন থেকে ক্রমাগতভাবে পাল্টাতে শুরু করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় আসার প্রথম দিকে দেখা গেছে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর আগ্রাসন। যদিও এটি বাংলাদেশের সবকটি রাজনৈতিক দলেরই স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় টিকে থেকে দলটি যেন ক্ষমতা হারানোকে ‘অনিয়মের’ মতোই বিবেচনা করছে। তাইতো ক্ষমতা ধরে রাখতে অদৃশ্যভাবে পাল্টে গেছে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ। 

বিগত বছরগুলোতে দেশের জাতীয় নির্বাচন যেমন ছিলো উৎসবহীন তেমনি চোখে পড়েনি বড় কোন সমাবেশ। যদি হয়েও থাকে তা কেবল ক্ষমতাসীন দলের আয়োজন ছিলো। যার ফলে ২০০৮ সালের আগে যারা দেশের রাজনীতি নিয়ে বুঝেনি তারা আর পরিচিত হতে উঠতে পারেনি রাজনৈতিক উৎসবের সাথে। দেশের নবীন জনগোষ্ঠীর কাছে ভোটের সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়ায়—ক্ষমতাসীন দল থেকে বাচাই! আর জাতীয় নির্বাচন হলে বিরোধী দলের ভোটারদের বাড়িতে আটকে রাখা! তাদের কাছে রাজনীতি হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন্দ্রীক। যেখানে তারা ছবির প্রতিযোগীতাকেই প্রধান্য দিতে করে। তোষামোদ এবং উশৃংখলাকেই অনেক নবীন মনে করতে শুরু করে রাজনীতিতে উপরে ওঠার ‘সিঁড়ি’।

তবে ২০২২ সালের শেষের দিকে একে পাল্টাতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রাজনীতির হাওয়া। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি—দুই দলই ঝুঁকছেন জনগণের দিকে। তাইতো সম্প্রতি চট্টগ্রাম -কক্সবাজারে জনসভা করেছেন আওয়ামী লীগ। আর সিলেট, রাজশাহী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করছেন বিএনপি। এই সমাবেশ করতে গিয়ে বিএনপিকে নানান ঝামেলা পোহাতে হলেও দীর্ঘ দিন পর এমন পরিবেশ দেশের রাজনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।

এদিকে দুই দলের এসব সভা সমাবেশ দেশের নবীন জনগোষ্ঠীকে নতুন রাজনৈতিক পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এসব সমাবেশ আগে দেখে অভ্যস্থ না হলেও ‘বেশ ভালো লাগছে’ বলে মন্তব্য নবীনদের। তাদের মতে রাজনীতিতে সভা সমাবেশ থাকলে নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন আরও বাড়বে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো আরও বেশি জনগণের ওপর ভর করবে। তারা চাইবে জনগণের মন জয় করতে, মূলত এটি দেশের উন্নয়নে কাজ করবে। 

দীর্ঘ ১১ বছর পর গত ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের জনসভায় আসেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। আর তাকে দেখতে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে জড়ো হয় লাখ লাখ নেতাকর্মী। সেই জনসভায় চট্টগ্রামের রাউজান থেকে এসেছিলেন মাসুদুল করিম। কলেজে পড়ুয়া এই তরুণ বলেন, প্রথমবারের মতো এরকম বড় কোন জনসভায় এসেছি। আগে কখনও এরকম পরিবেশ দেখার সুযোগ হয়নি। সত্যি খুব ভালো লাগছে। জনসভায় এসে অরেক বড় বড় মানুষের কথা শুনার সৌভাগ্য হলো, সেই সাথে এত মানুষের ভিড় সত্যি উৎসবমুখর। 

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সভা সমাবেশ করা কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের আরও রাজনৈতিক দল বিএনপির। তবে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জনসভা করেছে তারা। যেখানে ছিলো লাখ লাখ নেতাকর্মীর উপস্থিতি। আর এই জনসভায় অংশ নিতে পেরে অনেক নেতাকর্মী স্বস্তি পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে ঢাকার জনসভায় যোগ দেওয়া খালেকুজ্জামান নামে এক তরুণ বলেন,  রাজনীতি নিয়ে বুঝার বয়স হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। যার কারণে বিএনপির বড় কোন জনসভা চোখে পড়েনি। তবে এবার দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টাতে শুরু করেছে। সহবস্থানে ফিরছে দুই দল। এরকম জনসভায় আসার সুযোগ আগে হয়নি, এবার হলো, খুব ভালো লাগছে।

এদিকে বিএনপি জনসভা করলেও সংঘাত থেকে যে একেবারেই বেঁচে যাচ্ছে সেরকম কিছু নয়। দলটির সিলেট ও রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশের সময় চলেনি কোন গণপরিবহন। এছাড়া ঢাকায় অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশের স্থান নিয়ে হয়েছে নানান নাটক। এছাড়া নয়াপল্টনে পুলিশ-বিএনপির সংঘর্ষে বিএনপির শত শত নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এতকিছুর পরেও এক প্রকার সফল সমাবেশ করেছে দলটি। 

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত বিএনপির জনসভা চাপে পেলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে। তাই তারাও জনসভা করে বিএনপিকে জবাব দিচ্ছেন। আর বিদেশি কূটনীতিকদের চাপের মুখে আওয়ামী লীগ চাইলেও আর বিএনপিকে এক ঘরে করে রাখতে পারছেনা। যার কারণে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এখন দেখার বিষয় সেই হাওয়া কতদূরে পর্যন্ত বয়ে যায়?

আইআই/সিএন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন