বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪

শিরোনাম

যেভাবে সম্পূর্ণরূপে ক্যামেরা বন্দী করবেন সুন্দর মুহূর্তগুলো

রবিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৩

প্রিন্ট করুন

লাইফস্টাইল প্রতিবেদক: একটা যুগ ছিল, যখন ছবি তোলা বা কারো কাছে ক্যামেরা থাকা যেন বড়সড় বিষয়। স্টুডিওতে যেয়ে ছবি তুলতে হত বা কোন কিছুর ছবি, ভিডিও এত সহজ ছিল না। অনেক দিন অপেক্ষা করে হাতে ছবি পাওয়া যেত এবং সেটা অ্যালবামে যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা হত। আর এখন ছবি তোলা অনেক সহজ। বাজারের বিভিন্ন মডেলের ক্যামেরা বা হাই মেগাপিক্সেল সম্পন্ন ফোন সকলের হাতে হাতে। আমরা এখন চাইলেই আমাদের সুন্দর সময়গুলোর বা শখের কাজ কিংবা ঘুরতে যেয়ে মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির ছবি, ভিডিও ক্যামেরা বন্দী করতে পারি। এখন কীভাবে সঠিক করে ক্যামেরা বন্দী করা যায় সুন্দর মুহূর্তগুলো, তা নিয়েই টুকিটাকি টিপস শেয়ার করি সবার সাথে।

ক্যামেরা নিয়ে কিছু বেসিক ধারণা: যে কোন ডিভাইস ব্যবহার করার আগে তার সম্পর্কে ধারণা নেয়া জরুরী। অনেক সময় দেখা যায়, একটা ডিভাইস সম্পর্কে ঠিকভাবে না জানার কারণে ছবি তুলতে গিয়ে আমরা অনেক অপশন মিস করে ফেলি। ফলে ছবি সুন্দর হয় না। এই জন্য ম্যানুয়ালটায় এক বার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। তবে, ম্যানুয়াল পড়াটা অনেকের কাছে বিরক্তিকর লাগে। তাই, বিভিন্ন ফিচার নিয়ে যদি বার বার প্র্যাকটিস করা যায়, তাহলে ফটোগ্রাফি বিষয়টা সহজে আয়ত্তে আসে। এখন তো ইউটিউবেও বেশ ভিডিও অ্যাভেইলেবল ক্যামেরা নিয়ে।

আগে জেনে নিন ক্যামেরা সম্পর্কে-

গ্রিড মোড: যে কোন ফটোগ্রাফিতে এই ব্যাপারে জ্ঞান থাকতে হবে অবশ্যই। গ্রিড কী? যখন কোন ছবি এডিট করা হয়, তখন খেয়াল করবেন একটা ছবি স্কয়ারের মতন অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত। এই প্রত্যেকটা ভাগই গ্রিড। এখন ছবি তোলার সময় চেষ্টা করবেন ৩’×৩’ /৪’×৪’ গ্রিডে তুলতে। অর্থাৎ, ছবিতে সাবজেক্ট ফিক্সড করার মোট নয়টা বা ১৬টা বক্সের মাঝে থাকে। আর এই ৩’×৩’ মোডে রাখাকে বলে রুল অফ থার্ডস।

ফোকাস: বেশিরভাগ ক্যামেরাই অটো ফোকাসড হয়ে থাকে। তারপরও সাবজেক্ট চুজ করে ফোকাসিং ঠিক করে নিন। ধরুন, পাতার উপর প্রজাপতির ছবি তুলতে চান, এক্ষেত্রে, ফোকাসটা ঠিক করুন। না হলে পাতা বা প্রজাপতি দুইটাই ব্লারড হয়ে যেতে পারে।

এফ নাম্বার ও অ্যাপারচার: এফ নাম্বার হচ্ছে ক্যামেরা লেন্সের আলোক গ্রহণের ক্ষমতা। ফটোগ্রাফিতে অ্যাপারচার দিয়ে এই এফ নাম্বারকে বুঝানো হয়। এই এফ নাম্বার বা ফোকাল লেন্থ যত ছোট হবে, অ্যাপারচারের তত বড় হবে। এতে করে আপনি ঠিক করতে পারবেন যে, কতটুকু সাবজেক্টের ছবি নিতে চান। একটা লতানো গাছে বেয়ে ফুল ঝুলছে। এই ফোকাল লেন্থ বাড়িয়ে কমিয়ে ঠিক করতে পারবেন শুধু ফুলের ছবি নিতে চান নাকি গাছে থেকে ঝুলে পড়ছে এই দৃশ্যসহ। সেই সাথে এটি আপনার ক্যামেরা লেন্স কতটুকু আলো ক্যাপচার করতে পারে সেটাও নির্ধারণ করে। তাই, ক্যামেরা কেনার আগে লেন্সের উপর বেশ জোর দেয়া হয়।

ফটোগ্রাফিতে লেন্সের উপর জোর দিতে হবে-

শাটার স্পিড: ছবি কেমন হবে? স্থির নাকি চলমান। এই সব কিছু শাটার স্পিডের উপর নির্ভর করে। শাটার বাটন তো সকলেই চিনি। যখন ছবি তুলার সময় প্রেস করি, আলো ক্যামেরায় ঢুকে প্রথম পর্দায় পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ফিল্ম আলোতে এক্সপোজ হয়। এর পরের মুহুর্তেই দ্বিতীয় পর্দা নেমে যায়, ফলে এক্সপোজারে আলো আর ঢুকে না। এই যে দুই পর্দার মাঝামাঝি সময় এটাই শাটার স্পিড। এই স্পিড ৩০ সেকেন্ড থেকে ১/ ৮০০০ সেকেন্ড হয়ে থাকে। এই যেমন চলন্ত সাইকেলে কেউ আসছে এর ছবি তুলতে চান তাহলে শাটার স্পিড বাড়িয়ে দেয়ার ফলে আমরা মোটামুটি স্থির ছবি পাব। আর কমিয়ে দিলে ছবিটি ব্লারড মোশনে আসবে। একইভাবে চায়ে কিছু সুগার কিউব উপর থেকে ফেলছেন এই অবস্থায় ছবি তুলতে, চান তাহলে শাটার স্পিড বাড়িয়ে দিন। এটা সম্পুর্ণ ফটোগ্রাফারের ইচ্ছার উপরে ডিপেন্ড করে।

ডেপথ অফ ফিল্ড: ফটোগ্রাফি মূলত চারটা জিনিসের উপর নির্ভরশীল। তা হল ক্যামেরার অ্যাপারচার, কী লেন্স ব্যবহার হচ্ছে, কী ক্যামেরা ব্যবহার হচ্ছে আর ক্যামেরা থেকে সাবজেক্টের দূরত্ব। এই ব্যাপারগুলোতো আগেই আলোচনা করেছি। তাই, ছবি তোলার আগে চেষ্টা করবেন ডেপথ অফ ফিল্ড ঠিক আছে কিনা দেখে নেয়ার।

আইএসও স্কেল: একটা ভাল ছবি তুলতে এর স্কেলের মান অনেকাংশে নির্ভর করে। এটি ছবির উজ্জ্বলতার উপর প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল ক্যামেরার ক্ষেত্রে এই মান ১০০ থেকে ৬৪০০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। কোন আলোতে ছবি তুলছেন, সেটা বিবেচনা করে আইএসও এর মান বাড়াতে বা কমাতে হয়। রাতের বেলায় এটি বাড়িয়ে ছবি তোলা ভাল। রাতের বেলায় আইএসও বাড়িয়ে নিন। ছবি তুললে সেটির দৈর্ঘ্য প্রস্থের অনুপাত ঠিক কেমন হবে এটি তা বুঝায়। ফুল স্ক্রিন, ১:১, ৩:৪ নাকি ৯:১৬ ঠিক কতটুকু অনুপাতে রাখলে ছবিটা ঠিকমত আসবে, তা বুঝায়। এটার উপর আবার ক্রপিংয়ের এবং জুম করার ব্যাপারও জড়িত।

ক্যামেরার ফ্ল্যাশ: সব সময়ই উচিত পর্যাপ্ত দিনের আলোতে ছবি তোলা। তবে, আলো না থাকলে ফ্ল্যাশের ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফটোগ্রাফির বেসিক কিছু টিপস- সকলে প্রথম চিন্তা করুন, আপনার সাবজেক্ট কী? সঠিক সাবজেক্ট বেছে নেয়ার উপর ভাল একটা ছবি তোলা নির্ভর করে। একসাথে অনেক সাবজেক্ট ক্যামেরায় না এনে যে কোন একটির উপর ফোকাস করলে ছবি ভাল আসে; লাইট ব্যাপারটাকে সব সময়ই প্রাধান্য দিতে হবে। ন্যাচারাল লাইট হল বেস্ট চয়েস। সানরাইজের দুই ঘন্টা পরে এবং সানসেটের দুই ঘন্টা আগে হল গোল্ডেন টাইম; ক্লোজড পজিশনে ছবি তুলতে পারা। জুমিং করা যতটা এভয়েড করা যায় ততটাই ভাল। আর কাছে থেকে ছবি তুললে সেটি বেশ স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠে; ক্যামেরা ঠিকভাবে ধরতে শিখুন। অনেকেরই হাত কাপে বা ঘেমে যায়। যত স্থির থাকবেন, তত ছবি ভাল আসবে। আর এক্ষেত্রে আপনি ট্রাইপড ব্যবহার করতে পারেন যাতে স্থির রাখা যায়; ছবির সাবজেক্টকে আপনার ক্যামেরায় কতটুকু স্পেস দিবেন, সেটাও বিবেচনায় রাখুন। পাহাড় ও সমুদ্র একই সাথে তুলতে চাইলে, সমুদ্রকে ফোকাসে রাখতে চাইলে ছবির দুই তৃতীয়াংশ ভাগ সমুদ্রকেই রাখুন। ছবি ভাল আসবে;  যখন সাবজেক্ট উঁচু টাওয়ার বা বিল্ডিং বা গাছ পুরোটা ক্যামেরায় আনার সময় খেয়াল করবেন, উপর অংশ যেন ক্রপ হয়ে না যায়। তবে, কখনো কখনো সম্পূণ ছবির চেয়ে অর্ধেক ছবি বেশ ভাল আসে। তাই, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বুঝে ছবি তুলুন; লিভিং সাবজেক্টের একদম কাছে যেয়ে ধরুন, যেমন, বাচ্চার হাস্যোজ্জ্বল ছবি। এ ক্ষেত্রে, আই লেভেল বরাবর ছবি তুললে সেটা আকর্ষণীয় হয়; টাইমারের সঠিক ব্যবহার করুন। মনে করুন, আপনি জানেন ঠিক পাঁছ সেকেন্ড পরেই প্লেন যাবে। তখন সব পজিশন ঠিক রেখে টাইমার সেট করলে ছবি ভাল আসবে। তাই, জায়গা ও সাবজেক্ট বুঝে টাইমার ব্যবহার করবেন। সব ছবিতে টাইমারের প্রয়োগ না করাটাই ভাল।

লুকরুম ও হেডরুম: লুকরুম ও হেডরুম সেট করুন। আমরা প্রায়ই  ছবি তুলি যেখানে হাতে ফুল নিয়ে ফুলের দিকে তাকিয়ে আছি। এখানে যেহেতু সাবজেক্ট ফুলের দিকে তাকানো, তাই ফুল হাফ আনলে হবে নাহ অর্থাৎ লুকরুমে ফ্রেমে আনতে হবে।

এবার আসি হেডরুম। কেউ বসে আছে, এখন এমনভাবে ছবি তোলা হল যে সাবজেক্টের মাথার উপরের অংশ মানে হেড রুমের জন্য কোন স্পেস ই থাকলো না। এতে ছবির মান কমে যায়।

খেয়াল রাখুন ব্যাকগ্রাউন্ড: ব্যাকগ্রাউন্ড যতটা সুন্দর করা যায়। এখন তো ফুড ফটোগ্রাফিতে ব্যাকগ্রাউন্ডে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। একটা ভাল ছবি তুললেন অথচ ব্যাকগ্রাউন্ডে উপস্থিত থাকা অবাঞ্চিত জিনিসের কারণে পুরো ছবির সৌন্দর্য কিন্তু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একই সাবজেক্টের বিভিন্ন পজিশনে বার বার ছবি তুলুন। এতে করে পার্থক্যটা ভাল বুঝা যায়। কারণ, অনেক সময় ছবি ব্লারড হয়ে যেতে পারে বা লাইটের তারতম্য হতে পারে। তাছাড়া, যত প্র্যাকটিস করবেন, ততই ফটোগ্রাফির হাত আপনার দক্ষ হবে।

কীভাবে পারফেক্টলি ক্যামেরা বন্দী করবেন ছবি আশা করি বুঝা গেল।

ক্যামেরা নিয়ে টুকটাক কিছু কথা: ছবি তুলে সেটাকে যত এডিট করবেন, তত সুন্দর হবে। এক্ষেত্রে, অবশ্য এক্সট্রা মেমোরি কার্ডের প্রয়োজন হবে। যত ছবি তুলেন না কেন, সেগুলোকে ঠিকভাবে অ্যালবাম নাম ও ফোল্ডার দিয়ে সাজিয়ে রাখবেন। এতে করে ছবি খুঁজে পেতে সহজ হয়। মাঝেমধ্যে ক্যামেরাটা বের করে ক্লিন করে নিতে ভুলবেন না। আর চার্জ দিয়ে রাখা তো মাস্ট। কেননা, সুন্দর মুহূর্ত কিন্তু সীমিত সময়ের জন্যই হয়ে থাকে।

এই ছিল মৌলিক ফটোগ্রাফি নিয়ে কিছু কথা। একটা ছবি শুধু আপনার মেমোরিকে তাজা করে না, তার সাথে একেকটা ঘটনা বা মুহূর্তকেও বর্ণনা করে। তাই, ক্যামেরা যদি ব্যবহার করেই থাকেন, চেষ্টা করবেন যেন পারফেক্টলি ক্যামেরা বন্দী করা যায় সুন্দর মুহূর্তগুলো।

সূত্র: সাজগোজ

সিএন/এমএ

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন