বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শিরোনাম

ইরানের যুদ্ধনীতির মূল ভূমিকায় থাকা কে এই শামখানি

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বাড়িতে হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়ে ইসরায়েলকে উপহাস করেছিলেন আলী শামখানি। ইরানের সবচেয়ে কঠিন সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সময়েও তিনি দেশটির নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রে টিকে আছেন।

রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক এই কমান্ডার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিশ্বস্ত উপদেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চরম উত্তেজনার এই সময়ে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বন্দ্বের ওপরই নির্ভর করছে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব অর্ধশতাব্দী পর্যন্ত টিকবে কি না।

অক্টোবরে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাভেদ মোগুইকে শামখানি বলেছিলেন, আমি বেঁচে আছি, ‘বাস্টার্ডস’। এর মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলি হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং ১৯৭৩ সালের হলিউড সিনেমা ‘প্যাপিলন’-এর জেল থেকে পালানোর ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানেন।

চলতি বছর ৭০ বছর বয়সী শামখানিকে ইরানের নবগঠিত ‘প্রতিরক্ষা পরিষদের’ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খামেনি। গত বছর ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর এই পরিষদ গঠন করা হয়। সে সময় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক সাইটগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।

এই নিয়োগের মাধ্যমে তিনি আবারও ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন। এই পরিষদের কাজ হলো যুদ্ধকালীন ইরানের কার্যক্রম সমন্বয় করা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের যুদ্ধজাহাজ থেকে নতুন বিমান হামলার হুমকি দিচ্ছে। যদি আলোচনার মাধ্যমে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার নতুন কোনো চুক্তি না হয়, তবে এই হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

মঙ্গলবার কংগ্রেসে দেওয়া ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদের মদদদাতাকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না।

ইরান সন্ত্রাসবাদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা নেই। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইসরাইল বিশ্বাস করে, তেহরান যাকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বলছে— সেটির মূল লক্ষ্য সন্ত্রাসবাদকে মদদ দেওয়া।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে শামখানি বলেন, সীমিত হামলা’ একটি বিভ্রম। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ—তা যেখান থেকেই এবং যে কোনো মাত্রারই হোক না কেন—যুদ্ধের শুরু হিসেবেই গণ্য করা হবে। এর জবাব হবে তাৎক্ষণিক, সর্বাত্মক এবং নজিরবিহীন। তেল আবিবের হৃৎপিণ্ড এবং আগ্রাসীকে সমর্থনকারী সবার ওপর আঘাত হানা হবে।

১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ এই নেতা ২০২৩ সালে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি) থেকে বিদায় নেওয়ার পর খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি এক দশক ধরে ওই কাউন্সিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি এবং ২০১৮ সালে ওয়াশিংটনের সেই চুক্তি থেকে সরে আসার ঘটনাও ছিল। ওই ঘটনা চুক্তির প্রতি তার সংশয় আরও বাড়িয়েছিল।

এসএনএসসি হলো নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ সংস্থা। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে শামখানি খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইরানের ভাগ্য কী হবে তা নিয়ে যখন জল্পনা বাড়ছে, তখন শামখানি সাবেক এলিট ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কমান্ডারদের রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।

যুদ্ধের আগুনে পোড় খাওয়া

১৯৫৫ সালে তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশে একটি জাতিগত আরব পরিবারে জন্ম নেওয়া শামখানি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসি-র পদে পদোন্নতি পান। প্রথমে তিনি তার নিজ প্রদেশে বাহিনীর নেতৃত্ব দেন, যা ছিল সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র।

১৯৮২ সালের মধ্যে তিনি আইআরজিসি কমান্ডার-ইন-চিফ মোহসেন রেজায়ির ডেপুটি হন। রেজায়িও ছিলেন খুজেস্তানের বাসিন্দা, যার সঙ্গে তিনি ১৯৭০-এর দশকে শাহ-বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তিনি মন্ত্রিপরিষদের পদ পাওয়ার পাশাপাশি গার্ডদের স্থলবাহিনীর নেতৃত্ব দেন।

১৯৮৯ সালে নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি তাকে নিয়মিত নৌবাহিনীতে বদলি করেন, যা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এক বছরের মধ্যে তাকে একই সঙ্গে নিয়মিত এবং আইআরজিসি—উভয় নৌবাহিনীর কমান্ড দেওয়া হয়। এ সময় তিনি অসম বা এসিমেট্রিক সামুদ্রিক কৌশলের দিকে মনোযোগ দেন, যা প্রচলিতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য সাজানো হয়েছিল।

নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক চ্যানেল

শামখানিকে কূটনৈতিক ভূমিকায়ও মোতায়েন করা হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির অধীনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি সৌদি আরবে এক ঐতিহাসিক সফর করেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিই ছিল কোনো ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার প্রথম সৌদি সফর, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে অবদান রেখেছিল।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর, ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় তিনি রিয়াদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আলোচনায় নেতৃত্ব দেন। এর আট বছর আগে ইরানি বিক্ষোভকারীরা তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলা চালিয়েছিল।

তার নিয়োগগুলো প্রায়শই এমন সময়ে হয়েছে যখন তেহরান নিজের অবস্থান ছাড় না দিয়েই প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে।

গত দশকের পারমাণবিক আলোচনার সময়ও এই ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি দৃশ্যমান ছিল। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির অধীনে দায়িত্ব পালনকালে শামখানি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানোর কাজে যুক্ত ছিলেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরের সাক্ষাৎকারে শামখানি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, পেছনের দিকে তাকালে মনে হয় ১৯৯০-এর দশকেই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা বিবেচনা করা উচিত ছিল। ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিমান হামলার শিকার হওয়ার পর তার এই মন্তব্য প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে।

নিষেধাজ্ঞা এবং সমালোচনা

বছরের পর বছর ধরে শামখানি তার পরিবারের লেনদেন নিয়ে অভিযোগ ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২০ সালে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৫ সালে ইরান ও রাশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নিষিদ্ধ তেল পরিবহনের জন্য একটি ‘ভেসেল’ বা জাহাজ নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগে তার ছেলে মোহাম্মদ হোসেনকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

ট্রেজারি বিভাগের মতে, শামখানি পরিবারের ‘শিপিং সাম্রাজ্য’ তাদের বিপুল সম্পদ অর্জন করতে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করতে সাহায্য করেছে। তবে, দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে শামখানি প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

২০২৫ সালে তার মেয়ে ফাতেমেহ তার জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েতে খোলামেলা পোশাক পরা একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়েন। এটি অভিজাতদের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ উসকে দেয় এবং ক্ষমতাসীনদের রক্ষণশীল নীতি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিরোধকে সামনে নিয়ে আসে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন