ইরানে প্রাণঘাতী দমন–পীড়নের পর সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের উসকে দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন তথ্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা ইরানের শীর্ষ নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন, যাতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পায়। সাম্প্রতিক দেশব্যাপী দমন-পীড়ন অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পর এই উদ্যোগের কথা ভাবা হচ্ছে।
আলোচনায় থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় বড় পরিসরের হামলাও রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে
এ সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে একটি মার্কিন রণতরী ও সহায়ক যুদ্ধজাহাজ পৌঁছানোয় অঞ্চলটিতে ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হামলা হলে তা গত জুনে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো হামলার চেয়েও বড় হবে। তিনি নৌবহরটিকে ইরানের দিকে অগ্রসরমান একটি ‘আর্মাডা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইরানের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক অবস্থান
সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে তারা কূটনৈতিক যোগাযোগও খোলা রাখছে বলে জানা গেছে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আলোচনায় তেহরান প্রস্তুত, তবে উসকানি দেওয়া হলে তারা ‘আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তভাবে’ আত্মরক্ষা করবে।
ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক—যা পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করে। জাতিসংঘে ইরানের মিশনও জানিয়েছে, জোর করে সংঘাতে ঠেলে দিলে নজিরবিহীন প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
হামলায় সরকার পতনের প্রশ্নে সংশয়
ইসরাইলি কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু বিমান হামলা দিয়ে ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব কি না—তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র- ইসরাইল সমন্বয়ে যুক্ত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরালেও শাসনব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে পড়বে না; দ্রুতই নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক সংকটে সরকার দুর্বল হলেও এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
খামেনির প্রভাব অব্যাহত
৮৬ বছর বয়সি খামেনি দৈনন্দিন শাসন ও জনসমক্ষে উপস্থিতি কমিয়ে দিলেও যুদ্ধ, পারমাণবিক নীতি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা তার হাতেই রয়েছে। তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠদের কাছে অনেক দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলি লারিজানিও রয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর হিসাবে, সাম্প্রতিক এ বিক্ষোভে ইরানে ৫ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১৪ জন নিরাপত্তা সদস্য। ইরানি সরকারের হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১১৭।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে ইয়েমেনে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা হতে পারে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মিশর নাকি ওয়াশিংটনকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং তাদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না বলে জানিয়েছে।
এক আরব কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ট্রিগার টানতে পারে, কিন্তু এর পরিণতি আমাদেরই বয়ে নিতে হবে।’



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন