শারমিন রিমা:
ভোগ্যপণ্যের বাজারে গেলে কমবেশি সবার চোখ মাথায় উঠে। যা-ই কিনুক না কেন, ক্রয়কৃত পণ্যের লাগামহীন দাম। দাম যতই থাকুক, খেয়ে-পরে বাঁচতে হলে তো কিনতে হবে। এখন প্রশ্ন আসবে কেন হুরহুর করে দাম বাড়ছে খাদ্যের? তবে কি খাদ্যের এমন উচ্চমূল্যের সাথেই সকলকে খাপ খাইয়ে চলতে হবে? এ নিয়ে বিশেজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারি-পরবর্তী পরিস্থিতি আর মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্যের দাম বাড়ছে। কারণ করোনা মহামারির কারণে অনেক দেশেই শস্য থেকে আরম্ভ করে ভোজ্যতেলসহ নানান ধরনের কাঁচামালের উৎপাদন কমেছে। মূলত করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নেয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি অসুস্থতা, স্বল্প উৎপাদন ও বিতরণের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, ধান ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম ও আলু উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। বর্তমান মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়ে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন হয়েছে। করোনাকালে খাদ্য উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমান বোরো উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি টনেরও বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এ বছর সকল ফসলের উৎপাদনই বেশি হয়েছে। তবুও দেশে ভোগ্যপণ্যের লাগামহীন দাম। এর কোনো সদুত্তর নেই সংশ্লিষ্ট কারও কাছে।
অন্যদিকে বিবিসি’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বিপর্যয় আসতে পারে জাতিসংঘের এমন সতর্কতা আর বৈশ্বিক ক্ষেত্রে খাদ্য পণ্যের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্য দিয়েই চলতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস (১৬ই অক্টোবর) পালিত হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ-ভালো উৎপাদনে ভালো পুষ্টি, আর ভালো পরিবেশেই উন্নত জীবন’। তবে খাদ্যের আন্তর্জাতিক বড় প্রতিষ্ঠান ক্রাফট হেইনজ সতর্ক করে বলেছে যে মহামারি-পরবর্তী পরিস্থিতি আর মুদ্রাস্ফীতির কারণে “খাদ্যের উচ্চমূল্যের সাথেই খাপ খাইয়ে নিতে হবে”।
জাতিসংঘ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “ইথিওপিয়া, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ সুদান এবং ইয়েমেনে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে আছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বুরকিনা ফাসো এবং নাইজেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীও প্রায় একই পরিস্থিতিতে পড়েছে,”। এমন দুর্ভিক্ষময় পরিস্থিতিতে থাকা অন্তত ৪ কোটি মানুষকে সহায়তার জন্য দ্রুত তহবিল গঠনের আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা দা হাঙ্গার প্রজেক্টের তথ্য অনুসারে, প্রায় ৬৯ কোটি মানুষ বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ দরিদ্রতার সাথে বাস করছে, আর ৮৫ কোটি মানুষ দরিদ্রতার ঝুঁকিতে আছে কোভিডের কারণে। আবার এর মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী।
এ বিষয়ে দারিদ্র দূরীকরণ বিশেষজ্ঞ ড. কুলকার্নি বলেছেন, “দামের সাথে সরাসরি সম্পর্ক আছে চাহিদা ও সরবরাহের। যেখানে জনসংখ্যা আর খাদ্য চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে আবার পানির স্বল্পতা, মাটির গুনাগুণ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন প্রজন্মের কৃষিকাজে অনিহাসহ নানা কারণে চাষের জমি কমে যাচ্ছে। দরিদ্রতা সরাসরি দামের সাথে জড়িত- যেমন দরিদ্রতা বাড়ছে এবং একই সাথে দামও বাড়ছে।’’
যেহেতু অর্থনীতিতে এমন পণ্যের সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছে, অনেকেই হয়তো ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী তা করতে পারছে না, যা দাম বাড়াতে অবদান রাখছে। পাশাপাশি উচ্চ বেতন আর জ্বালানি মূল্যও উৎপাদনকারীদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ভারতের মুম্বাইয়ের রাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ড. সারিকা কুলকার্নি ক্রাফট হেইনজের প্রধান মিগুয়েল প্যাট্রিসিওর সাথে একমত যে খাদ্যমূল্য বেশিই থাকবে। তাই কৃষকদের সহায়তা এগিয়ে আসতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা ও সরকারগুলো মানুষকে দরিদ্রতা থেকে বের করে আনতে প্রচলিত উপায়গুলো দেখতে পারে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) মহাপরিচালক বলছেন, কৃষি খাদ্য পদ্ধতিতে সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে এবং নষ্ট করার মতো কোন সময়ই এখন নেই।
ড. কুলকার্নি বলছেলেন, জলবায়ু সহনশীল কৃষির ব্যবস্থা করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পানির স্বল্পতা দূর করা, বীজ ও অন্য দরকারি কাঁচামালের দাম কমানো এবং নিজের জন্য শস্য রাখতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন সমস্যা চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেয়ার সময় আছে।’



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন