১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেফতারের পর দীর্ঘ সময় লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তবে ২০২৬ সালের শুরুতেই সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত শুক্রবার রাতে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আচমকা হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। রাতের অন্ধকারে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে তার রাজধানী থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক লাগামহীন ক্ষমতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তার মাধ্যমে এই অভিযানের কথা জানান। ৭৪ শব্দের সেই পোস্টে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নিজের বিচিত্র সব পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নে তিনি কতটা বেপরোয়া হতে পারেন। আন্তর্জাতিক আইন বা এই ধরনের পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী পরিণতির তোয়াক্কা না করেই তিনি মাদুরোকে মার্কিন একটি জাহাজে করে নিউইয়র্ক নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (সাদ্দাম ও নরিয়েগা)
এই ঘটনা ১৯৮৯ সালে পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেফতারের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। মাদুরো ও নরিয়েগা—উভয়ের বিরুদ্ধেই বিতর্কিত নির্বাচন এবং মাদক পাচারের অভিযোগ ছিল।
তবে নরিয়েগার ক্ষেত্রে একটি ছোটখাটো যুদ্ধের পর তিনি ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। অন্যদিকে মাদুরোর পরিণতি অনেকটা ২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ধরা পড়ার ঘটনার সঙ্গেও তুলনীয়। মজার ব্যাপার হলো, নরিয়েগা এবং সাদ্দাম—উভয়েই একসময় ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন, ঠিক যেমন ভেনেজুয়েলার তেল রাজনীতি একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে ছিল।
মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও ট্রাম্পের ‘মনরো’ মতবাদ
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদুরো অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে মাদক পাচারে জড়িত। এই অভিযোগে গত কয়েক মাস ধরেই ক্যারিবীয় সাগরে নৌবহর ও পরমাণু-ডুবোজাহাজ মোতায়েন করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পেছনে কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং ১৯ শতকের ‘মনরো’ মতবাদ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যও রয়েছে। এই মতবাদ অনুযায়ী পশ্চিম গোলার্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের একক ‘প্রভাব অঞ্চল’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করা এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক প্রভাব
মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও এই বিচারকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখছেন, কারণ হোয়াইট হাউস দীর্ঘকাল ধরেই ভেনেজুয়েলার বামপন্থি সরকারকে হটাতে মরিয়া ছিল।
বর্তমানে প্রশ্ন উঠছে, মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলায় কি শান্তি ফিরবে নাকি গৃহযুদ্ধ শুরু হবে? বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো বা এডমান্ডো গঞ্জালেসের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত হলেও দেশটির সেনাবাহিনী এখনো মাদুরোর অনুগত থাকতে পারে। ট্রাম্পের জন্য এটি একটি বড় বিজয় হলেও, এর ফলে ভেনেজুয়েলায় যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন