সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের কড়া অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। যা এই অঞ্চলের সার্বিক স্থিতিশীলতার ব্যাপারটি নতুন করে ভাবাচ্ছে।
যে আফগানিস্তানকে একসময় পাকিস্তান তাদের ‘কৌশলগত সুরক্ষা-বলয়’ হিসেবে বিবেচনা করত, সেই কাবুল আজ ইসলামাবাদের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এই অঞ্চলের সমীকরণকে আমূল বদলে দিচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে পাকিস্তানে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) এর একের পর এক আত্মঘাতী হামলা এবং সেনাসদস্যদের প্রাণহানি ইসলামাবাদকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারি) নানগারহার ও পাক্তিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলা ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তান দাবি করছে, তারা আফগান মাটিতে আশ্রিত জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তবে কাবুল এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পালটা প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। এর ফলে কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় গত বছরের শেষে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি এখন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তালেবান ক্ষমতায় আসার সময় যে ভারত ছিল উৎকণ্ঠিত, সেই ভারতই আজ কাবুলের অন্যতম প্রধান সহযোগী। গত অক্টোবর মাসে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ছয় দিনের ভারত সফর এবং কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসের কার্যক্রম পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন এবং পাকিস্তানের বিমান হামলার নিন্দা জানানো এটিই প্রমাণ করে যে নয়াদিল্লি এখন কাবুলের জন্য একটি ‘কূটনৈতিক ঢাল’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নয়া দিল্লি কেবল মানবিক সহায়তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, চাবাহার বন্দর উন্নয়নের মাধ্যমে আফগানিস্তানের সাথে সরাসরি বাণিজ্যিক রুট তৈরির যে কৌশল ভারত নিয়েছে, তা পাকিস্তানকে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দিচ্ছে। পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করছে যে, ভারতের প্রত্যক্ষ মদদেই তালেবানরা ইসলামাবাদকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মেলেনি, তবে ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা ও কৃষি খাতে তালেবানের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পাকিস্তান এখন একদিকে ভারতের সঙ্গে পূর্ব সীমান্তে এবং অন্যদিকে তালেবান নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম সীমান্তে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। মার্কিন-ইরান উত্তজনা যখন তুঙ্গে, তখন পাকিস্তানের এই দুই সীমান্তের ব্যস্ততা তাদের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দিল্লি-কাবুলের এই নতুন অক্ষশক্তি কেবল পাকিস্তানের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বিস্তারের এক মাস্টারস্ট্রোক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কাবুল যদি শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদের চেয়ে নয়াদিল্লিকেই বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বেছে নেয়, তবে তা হবে পাকিস্তানের গত কয়েক দশকের আফগান নীতির এক চরম পরাজয়।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন