ইফতেখার ইসলাম:
বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, কক্সবাজারের চকরিয়ার,শেরপুরের শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ীর গারো পাহাড়ে গেলো দু সপ্তাহে ৭ টি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আর এসব হাতি হত্যার পেছনে রয়েছে স্থানীয়দের হাত। নিজেদের ফসল ও বসতবাড়ি হাতির হাত থেকে রক্ষা করতে এসব বন্যপ্রাণী মারা হচ্ছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
জানা গেছে, গত ৬ নভেম্বর সকালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাইরতলী গ্রামের মইত্তাতলী পাহাড়ি এলাকার একটি ধানখেত থেকে মৃত এাটি হাতি উদ্ধার করা হয়। পরে ৮ নভেম্বর রাতে চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ছড়াখোলা এলাকায় একটি হাতির পাল ধান খেতে আসে। এ সময় বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা যায় একটি হাতি। পরদিন ৯ নভেম্বর শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী রানিশিমূল ইউনিয়নের মালাকোচা গ্রামে বিদ্যুতের ফাঁদে ফেলে একটি পুরুষ হাতি হত্যা করা হয়। একই দিন চট্টগ্রামের বান্দরবানে একটি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটে।
এছাড়া ১২ নভেম্বর ভোর রাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে একটি ধান ক্ষেতের পাশে আরো একটি হাতিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এই ঘটনায়ও ব্যবহার করা হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদ। ১৩ নভেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ছড়াখোলা এলাকার একটি গর্ত থেকে আরো একটি মৃত হাতি উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাতা সীমান্তে শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) ভোরে একটি হাতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এসব হাতি হত্যার পিছনে কোন না কোনভাবে জড়িয়ে আছে স্থানীয়রা। হত্যায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহিত হচ্ছে ‘বৈদ্যুতিক ফাঁদ’। অধিকাংশ হাতি হত্যা হয়েছে ‘ধানক্ষেতে’।
এইদিকে দেশে একের পর এক বন্যপ্রানী হত্যায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে এভাবে হাতি হত্যা চললে দেশের জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। যা দেশের জন্য মোটেও ভালো খবর হবে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম রায়হান সরকার বলেন, হাতি আমাদের পরিবেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু আমরা কি এ মূল্য বুঝতে পারছি? যদি বুঝতাম তাহলে এদের এভাবে মারার কোন প্রশ্নই আসতো না।
তিনি বলেন, শেরপুরের মানুষ বর্ষা কালে পাথর উত্তোলন করে আর শীতের মৌসুমে তারা ফসল উৎপাদন করে। এসময় কিছু হাতি ওই অঞ্চলে যায়। ১০-১৫ দিন বা তার কম বেশি সময় সেখানে অবস্থান করে। কিন্তু মানুষ তা সহ্য করে নিতে বা মানিয়ে নিতে পারে না।
তিনি বলেন, হাতি তৃণভোজী প্রাণী। এরা লতাপাতা শস্য এগুলো খাবে। তারা তো বুঝে না কোনটায় ক্ষতি হচ্ছে। তাহলে যে মানুষের বিবেক বুদ্ধি আছে তারা কেন বুঝছে না?
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী বনের ১ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে কোন বসতি থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে বন ঘেঁষে গড়ে উঠছে বসতি। এই বসতির কারণে বনের আকার ছোট হচ্ছে। আমাদের কক্সবাজার, বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় বন্যপ্রাণীর যে অভয়ারণ্যে রয়েছে সেখানে গেলে দেখা যাবে দালান আর বসতঘরে পূর্ণ। কিন্তু অভয়ারণ্যে তো এরকম হওয়ার কথা নয়!তাছাড়া বনের ভেতর খাবারের অপর্যাপ্ততার কারণে হাতিগুলো ফসলে হানা দিচ্ছে। বনে খাবার পেলে তো তারা শক্তি ব্যয় করে লোকালয়ে আসতো না।
তিনি বলেন, বনের মধ্যে নানান পোকামাকড়ের জন্ম হয়। যেগুলো বছরের একটা সময় গিয়ে বেড়ে যায়। আর এসব পোকামাকড় ফসলের ক্ষতি করে। হাতিসহ বনের অন্যান্য প্রাণী এসব পোকামাকড় কমাতে সহায়তা করে। তাছাড়া হাতি বিশাল এলাকা নিয়ে চলাফেরা করে। তারা ভারত মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে। আর তাদের মাধ্যমে জঙ্গলে উদ্ভিদের বংশবিস্তার বাড়ে। যদি এভাবে হাতি নিধন হয় তাহলে পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব পেলবে। যা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জলবায়ুতেও প্রভাব ফেলবে।
অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম রায়হান সরকার বলেন, হাতি নিধনরোধে আমাদের খুব বেশি সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে আমাদের জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। তারা যদি এই বিষয়ে কঠোর না হয় তাহলে কোন কিছুতেই হাতি হত্যা বন্ধ করা যাবে না।

এইদিকে সম্প্রতি শেরপুর ও চট্টগ্রামে হাতির বিচরণক্ষেত্রগুলো সরজমিনে পর্যাবেক্ষণ থেকে জানা গেছে, পাহাড়ের ঢালে বা পাদদেশে স্থানীয়রা ফসল চাষ করে থাকেন। ফসল তোলার সময় হাতির উৎপাত বেড়ে যায়। আর এসময় চলে হাতি হত্যার নির্মমতা।
চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। দেশে এখন পাকা ধানের মৌসুম চলছে। আর এসময় হাতিগুলো খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে এসে ফসলি জমিতে হানা দিচ্ছে। আর এটি মানতে পারছে না চাষিরা!
হাতিরা যেন শীতের সবজি বা ধানক্ষেত নষ্ট করতে না পারে সেজন্য জমির চারপাশে জিআই তারের বেড়া দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তারগুলো এতোটাই সূক্ষ্ম যে কারও পক্ষে এক হাত দূর থেকে দেখাও সম্ভব না।
এখনো পর্যন্ত বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়েই মারা গিয়েছে পাঁচটি হাতি। বাকি দুটির মধ্যে একটির মাথায় গুলি করা হয়েছে। সর্বশেষ মারা যাওয়জ হাতিটির মৃত্যুর কারণ এখনও জানা যায়নি। আর এসবকিছু ফসল রক্ষাকে কেন্দ্র করে ক্ষেতের মালিকরা ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন গণমাধ্যমকে বলেন, বন্যপ্রাণী হত্যা বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। হাতি সংরক্ষণে এ মুহূর্তে অন্তত দুটি কাজ করতে হবে। একটি হচ্ছে- বন বিভাগের জমিতে কোনো ফসল চাষ করা যাবে না। আরেকটি হচ্ছে- প্রত্যেকটি ঘটনাতেই মামলা হচ্ছে, আইন অনুযায়ী মামলাগুলো যথোপযুক্ত মনিটরিং করতে হবে।
গেলো ২ বছরে ৩৫ হাতির মৃত্যু:
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত মারা গেছে ৩৫টি হাতি। যার মধ্যে চট্টগ্রামে, বান্দরবান ও কক্সবাজারে বেশি। যার কিছু অসুস্থতাজনিত ও বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেলোও অধিকাংশ হত্যা হয়েছে মানুষের হাতে।
বন বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, ২০২০ সালে মারা গেছে ২০টি হাতি। যার মধ্যে ১০টি অসুস্থতার কারণে ও দুটি বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে। এছাড়া কক্সবাজারে তিনটি হাতিকে গুলি করে এবং পাঁচটি হাতি বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হত্যা করা হয়।
২০২১ সালে সাড়ে ১০ মাসে মারা গেছে ১৫টি হাতি। যার মধ্যে চারটি হাতির মৃত্যু হয়েছে এ মাসের ৬ থেকে ১৯ নভেম্বরের মধ্যে, যার তিনটিকে হত্যা করা হয়। এবছর মারা যাওয়া হাতিগুলোর মধ্যে চারটি অসুস্থতাজনিত ও দুটি বার্ধক্যজনিত এবং দুটি পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেছে। এছাড়া তিনটি বৈদ্যুতিক ফাঁদে এবং একটি হাতিকে গুলি করে মারা হয়েছে
আইইউসিএন জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বন্যহাতির সংখ্যা ছিল ২৬৮টি।
যেভাবে হাতি থেকে রক্ষা হবে মানুষের জানমাল:
মহাবিপন্ন হাতি সংরক্ষণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ বন বিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘স্ট্রেনদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন’ প্রকল্পের আওতায় স্ট্যাটাস সার্ভে অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব এলিফ্যান্ট অ্যাকশন প্ল্যান ফর বাংলাদেশ উপপ্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৬ সালে মানুষ-হাতি সংঘাত নিরসনে বিস্তারিত ধারণা দেওয়ার জন্য একটি মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা সহায়িকা প্রকাশ করা হয়।
সহায়িকাতে সে ধরনের বেশ কিছু পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন দূর থেকেই হাতির চলাচলের ওপর নজর রাখার জন্য উঁচু গাছ বা টাওয়ারের ওপর স্থাপিত পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প ওয়াচ টাওয়ার এগুলোর মধ্যে একটি। কাঁটাযুক্ত এবং ছোট ছোট বীজ আছে এমন গাছ বা উদ্ভিদ হাতি এড়িয়ে চলে। এ ধরনের গাছপালা দিয়ে ফসলের জমি ঘেরাও দিয়ে রাখলে এতে হাতির আক্রমণের আশঙ্কা অনেক কমে যায়। একইভাবে চাষিরা হাতির অপছন্দের শস্যগুলো চাষ করলে হাতির আক্রমণের হার কমে যাবে।

বিদ্যুৎ–চালিত বেড়া দিয়ে জমির সীমানা ঘেরাও করার পর যদি সেখানে হাতি আসার চেষ্টা করে, তবে হাতিটি ওই তারের অতি নিম্নমাত্রার বৈদ্যুতিক প্রবাহে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হবে। এতে হাতি ভয়ে আর এ জায়গায় আসবে না।
ট্রিপ অ্যালার্ম স্থাপন পদ্ধতি বা একটি ধাতব তারে ঘণ্টা বা অ্যালার্ম লাগিয়ে বনের সীমানার গাছগুলোতে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই সীমানা অতিক্রম করতে গেলেই হাতির সংস্পর্শে এসে তারটিতে টান পড়ে উচ্চ স্বরে ঘণ্টা বেজে ওঠে। চিলি রোপ বা চিলি স্মোক পদ্ধতিতে একটা মোটা দড়িতে আঠালো কিছু জিনিসের সঙ্গে মরিচের গুঁড়া মেখে ফসলের খেতের চারপাশে এমনভাবে রেখে দিতে হবে, যাতে বাতাসের তোড়ে বনের দিকে মরিচের ঝাঁজটি যায়। হাতি যখনই বন থেকে খেতের দিকে আসবে, তখন তার নাকে মরিচের ঝাঁজ গেলে সে আর এই মুখী হবে না।
এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনা মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলা, হাতির পছন্দের খাবার মজুত না করা, রাতের বেলায় বাইরে বের হতে হলে একটি টর্চলাইট সঙ্গে রাখা, মাতাল অবস্থায় বনে না হাঁটা, সাদা বা উজ্জ্বল রঙের কাপড় না পরা, হাতির খাওয়াদাওয়ার সময় সেটাকে বিরক্ত না করা, বনে ধূমপান না করা, বাড়িতে উজ্জ্বল রং ব্যবহার না করা, হাতি আক্রান্ত হলে কখনো সোজাসুজি না দৌড়ে এঁকেবেঁকে দৌড় দেওয়া, চিৎকার করতে থাকাসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এ সহায়িকাতে। হাতির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হলে খুব তাড়াতাড়ি (অনধিক ৩০ দিনের মধ্যে) ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বনের ছাতা হাতি:
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য হাতিকে আমব্রেলা স্পিসিসও বলা হয়। একটি হাতি বনে ছাতার মতো কাজ করে। হাতি টিকে থাকলে বনও টিকে থাকবে। বন টিকে থাকার অর্থই হলো হাজারো জীববৈচিত্র্যের জীবন বেঁচে যাওয়া। কেউ কেউ হাতিকে বনের ইঞ্জিনিয়ার বলে থাকব। হাতির বিষাদ, হাস্যরস, সহানুভূতি, সহযোগিতা, আত্মসচেতনতা, সরঞ্জাম ব্যবহার এবং চমৎকার শেখার ক্ষমতা আছে। হাতি তাদের মৃতদের সম্মান দেয় এবং মৃতদের জন্য আচার-অনুষ্ঠান করে। এমনকী শুঁড় দিয়ে সেই মরা হাতিকে স্পর্শও করে। মাঝে মাঝে সঙ্গীর মৃতদেহ নিজেরাই বয়ে নিয়ে যায়।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন