শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

‘পাড়ার মাস্তান’ এখন আওয়ামী লীগের সাংসদরা!

মঙ্গলবার, জুলাই ১৯, ২০২২

প্রিন্ট করুন

চলমান নিউইয়র্ক ডেস্ক: দেশে আইন প্রণয়নকারী সাংসদদের একাংশ এখন পেটানো নিয়ে আলোচনায়। শিক্ষক, দলীয় নেতা-কর্মীসহ কেউই তাদের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। তাদেরকে রীতিমত ‘পাড়ার মাস্তান’ বলছেন কেউ কেউ। সাংসদদের কেন এ নেতিবাচক আত্মপ্রকাশ?

সর্বশেষ আলোচনায় এসেছেন কুমিল্লা- চার আসনের সরকার দলীয় সাংসদ রাজি মোহাম্মদ ফখরুল। তিনি দেবিদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালোম আজাদকে কিল ঘুসি মেরে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। খোদ সংসদ ভবনের ভিতরেই এ ঘটনা ঘটে। শনিবার (১৬ জুলাই) বিকালে জাতীয় সংসদের এলডি হলে দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির বৈঠকে তৃণমূলে কমিটি গঠনকালে কিল-ঘুসির ঘটনা ঘটে। উপজেলা চেয়ারম্যানও কিল-ঘুসির পাল্টা জবাব দিয়েছেন বলে জানা যায়।

গত ৭ জুলাই রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে নিজের ব্যক্তিগত চেম্বারে ডেকে নিয়ে মারপিট করেন রাজশাহী- এক আসনের সরকার দলীয় সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী৷ ওই অধ্যক্ষকে তিনি ১৫ মিনিট ধরে কিল-ঘুসি ছাড়াও হকি স্টিক দিয়ে পেটান। অধ্যক্ষের অপরাধ তিনি সাংসদের কথা মত একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত ছাড়া তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে রাজি হন নি।

এভাবে মারপিট করে সরকার দলীয় আরো যেসব সাংসদ আলোচনায় আছেন, তারা হলেন শওকত হাচানুর রহমান রিমন, আনোয়ারুল আজীম, কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, আবদুর রহমান বদি প্রমুখ।

গত ১৯ মে ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার সরকারি মাহতাব উদ্দিন কলেজে ঢুকে দুই সহকারী অধ্যাপককে মারধর করেন ঝিনাইদহ- চার আসনের সাংসদ আনোয়ারুল আজীম আনার। সাংসদের এক প্রিয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার কাগজপত্র চেয়ে না পেয়ে তিনি এ কাজ করেন বলে অভিযোগ।

বরগুণা- দুই আসনের সাংসদ শওকত হাচানুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পাথরঘাটা এলাকায় এক সভা মঞ্চে উঠিয়ে নজরুল ইসলাম নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে মারধর করেন।  নজরুল ইসলামের মাইক্রোবাস সাংসদের গাড়ি বহরকে রাস্তায় জায়গা ছাড়তে দিতে  করায় তিনি এভাবে প্রকাশ্যে শাস্তির ব্যবস্থা করে ন। গত ২১ মে ফোরকান নামে এক চায়ের দোকানদারকেও মারধর করেন তিনি৷

ঢাকা- পাঁচ আসনের সাংসদ কাজী মনিরুল ইসলাম মনু গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর দলিল লেখক আনোয়ার হোসেনকে তার অফিসে দলবল নিয়ে গিয়ে মারধর করেন।

কক্সবাজারের সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদি সাংসদ থাকার সময়েও এমন করেছেন। গত ২২ এপ্রিল তিনি টেকনাফ পৌর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তার দলবল নিয়ে প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের মারধর করেন। তার পছন্দমত কমিটি না হওয়ায় তিনি ওই হামলা চালান। এরা সবাই শাসক দল আওয়ামী লীগের সাংসদ। মারপিটের ঘটনার পর তাদের বিরুদ্ধে কোন পুলিশি বা দলীয় ব্যবস্থা নেয়ার কোন খবর পাওয়া যায় নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মঞ্জিল মোরসেদ বলেন, ‘সাংসদদের কাজ সংবিধানে স্পষ্ট করা আছে। তাদের কাজ দেশের আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু এখন দেখছি, তারা মারপিট করছেন। আসলে যেমন সাংসদ তেমন তারা আচরণ করছেন। দল থেকেও তাদেরই চাওয়া হয়েছে। নয়তো তারা মনোনয়ন পেয়েছেন কীভাবে! আমি মনে করি, তাদের আচরণ দেখেই এ সংসদের কী ভাবমূর্তি আছে তা বোঝা যায়৷ কেউ সংসদের ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবলে তারা সাংসদ হতে পারতেন না। আর দলও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত। কিন্তু ব্যবস্থা তো নেয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সাহস পায় না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘সাংসদরা এখন বেসামাল হয়ে উঠেছেন। তারা সব জায়গায় আধিপত্য বিস্তার করতে চান। আর যেখানেই তারা বাধা পান, সেখানেই তারা আগ্রাসী হয়ে উঠছেন। এমনকি তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও দখল করতে চাইছেন। সেখানে তাদের মধু আছে। তাই তারা শিক্ষকদেরও ছাড়ছেন না।’ তার কথায়, ‘এটা দল ও সরকারের দেখা উচিত। তা না হলে তো শৃঙ্খলা থাকবে না।’

তবে আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, ‘যেসব সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারা কিন্তু দলের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে নাই। তারা যা করছেন, তা আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শবিরোধী। তাদের কাজ নিন্দনীয়। শেখ হাসিনা তাদের ক্ষমা করবেন না। এমনও হতে পারে, আগামী নির্বাচনে তারা আর মনোনয়ন পাবেন না।’

এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা তো দেখা যাচ্ছে না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেয়া হয়, তাই সময় লাগে। এর আগে তখনকার সাংসদ লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এ দিকে, শিক্ষা মন্ত্রী দীপু মনি সাংসদদের হাতে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের মার খাওয়ার ঘটনার বিচারের ভার জাতীয় সংসদের স্পিকারের হাতে দিয়েছেন। তিনি রোববার (১৭ জলাই) ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাংসদদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগগুলো উত্থাপন হওয়ায় খুব বিব্রতকর। আর সেগুলো যদি সত্য হয়, সত্য প্রমাণিত হয়, সেগুলো আরো বিব্রতকর। তবে যদি কোন সাংসদ এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকেন, সে ক্ষেত্রে সেই সাংসদের বিরুদ্ধে আমরা মন্ত্রণালয় হিসেবে সরাসরি কোন ব্যবস্থা নিতে পারি না। যেটি আমরা করতে পারি, তা হল, আমরা স্পিকারের শরণাপন্ন হতে পারি ও তার মাধ্যমে তার কাছে অভিযোগ উত্থাপন করে আমরা এটির একটি সমাধান চাইতে পারি।’

এ ব্যাপারে চেষ্টা করেও জাতীয় সংসদের স্পিকারে বক্তব্য পাওয়া যায় নি।

সিএন/এমএ

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন