মোহাম্মদ আলী: বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী, মহিয়সী নারী, বাঙালির সব লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলনের নেপথ্যের প্রেরণাদাত্রী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। আজ ৮ আগস্ট তার ৯১তম জন্মদিন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ফার্স্ট লেডি।
শেখ ফজিলাতুন্নেছার উৎসাহেই বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লিখেছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার সহধর্মিনী এক দিন জেল গেটে বসে বললেন, ‘‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’’ বললাম ‘‘লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি, যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলো শুনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।
বঙ্গবন্ধু যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবন্দী, তখন অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিল। শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে ভয় দেখানো হয়েছিল, পাকিস্তানীদের শর্ত না মানলে তিনি বিধবা হবেন। কোন ভয়ের কাছে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মাথা নত করেননি। বঙ্গবন্ধুকে সাহস যুগিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্যারোলের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। গণঅভ্যুত্থানের চাপে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৭১ এর ৭ মার্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বেডরুমে বিশ্রাম নেওয়ার সময় শেখ ফজিলাতুন্নেছা বলেছিলেন, ‘তোমার মন যা যায়, তুমি তাই বলবে।’
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ১৯৩০ সালের এ দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল রেনু। তার পিতার নাম শেখ জহুরুল হক ও মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। পাঁচ বছর বয়সে তার পিতা ও মাতা মারা যান। তিনি তার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাতো বোন ছিলেন। শেখ মুজিবের বয়স যখন ১৩ ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার বয়স যখন মাত্র তিন, তখন পরিবারের বড়রা তাদের বিয়ে ঠিক করেন। ১৯৩৮ সালে বিয়ে হওয়ার সময় রেনুর বয়স ছিল আট বছর ও শেখ মুজিবের ১৮ বছর। পরে এ দম্পতির দুই কন্যা ও তিন ছেলে হয়। তারা হলেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১২ মে বেগম ফজিলাতুন্নেসা পরিবারের অন্য সদস্যদের (শেখ হাসিনা, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল, এমএ ওয়াজেদ মিয়া এবং অন্যান্য) সাথে মগবাজার অথবা কাছাকাছি কোন এলাকার এক ফ্ল্যাট থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং ধানমন্ডির বাড়ি ২৬, সড়ক ৯ এ (পুরনো ১৮) ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় ছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, এক দল নিম্নপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির বাস ভবন আক্রমণ করে শেখ মুজিব, বেগম ফজিলাতুন্নেসা ও তার পরিবারের সদস্য এবং তাদের ব্যক্তিগত কর্মচারীদেরকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন ফজিলাতুন্নেছার দশ বছরের ছেলে শেখ রাসেল, তার বাকি দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল এবং রসি জামাল, ভাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, দেবর শেখ নাসের, ভাতিজা শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার স্ত্রী আরজু মণি। সে সময় পশ্চিম জার্মানি সফরে থাকার কারণে শুধুমাত্র তার কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা প্রাণে রক্ষা পান। পরে তাদেরকে বাংলাদেশ আসতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনা করে অসন্তুষ্ট আওয়ামী লীগের সহকর্মী এবং সেনা কর্মকর্তারা, যার মধ্যে ছিল মুজিবের সহকর্মী এবং প্রাক্তন বিশ্বাসপাত্র খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তিনি তৎক্ষণাৎ রাষ্ট্রপতির উত্তরসূরি হন। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের ‘ঢাকা ইউজিন বোস্টার’ বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে লরেন্স লিফশুলজ সিআইএকে এ অভ্যুত্থান এবং হত্যার জন্য অভিযুক্ত করেন।
মুজিব হত্যার ফলে সারা দেশ কয়েক বছরের রাজনৈতিক অশান্তির মধ্যে নিমগ্ন হয়। অভ্যুত্থানের নেতাদের সিংহাসনচ্যুত করা হয়। একের পর এক পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক হত্যার ফলে দেশটি অচল হয়ে পড়ে। ১৯৭৭ সালে আরেকটি অভ্যুত্থানের পর শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপিত হয় এবং সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতা পান। ১৯৭৮ সালে জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে নিরাপত্তা অধ্যাদেশ জারি করেন এবং মুজিব হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীকে খালাস দেন।
বেগম ফজিলাতুন্নেসার স্মরণে বঙ্গবন্ধু মেমরিয়াল ট্রাস্ট মালয়েশীয় হাসপাতাল কেপিজে এর সাথে একত্রিত হয়ে ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং নার্সিং কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মালেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাক।
২০২১ সাল থেকে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ পদক চালু করছে সরকার। প্রতি বছর ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে মনোনীত নারীদের এ পদক দেওয়া হবে।
ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কেবল একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়কের শুধু সহধর্মিনীই নন, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম এক নেপথ্য অনুপ্রেরণাদাত্রী। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। ছায়ার মত অনুসরণ করেছেন প্রাণপ্রিয় স্বামী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে। এ আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অবদান রেখেছেন। জীবনে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন, এ জন্য অনেক কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাকে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে অবদান- সেখানে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার সহযোগিতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ৯১তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধা আর অফুরন্ত ভালবাসা রইল তার প্রতি।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন