ভেনেজুয়েলার দীর্ঘকালীন শাসক নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের অভিযানে আটক করে নিউইয়র্কের কারাগারে পাঠানোর পর দেশটির রাজনীতি এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে।
এই নজিরবিহীন ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও ভেনেজুয়েলার ভেতরে ও বাইরে বসবাসরত নাগরিকদের মধ্যে এখনো মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করছে। বর্তমানে মাদুরো দম্পতি নিউইয়র্কের আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মাদুরোর আকস্মিক পতন হলেও ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থায় খুব বড় কোনো পরিবর্তন এখনো আসেনি। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা কোনো বিদেশি শক্তির মাধ্যমে নয় বরং তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে। মজার বিষয় হলো, মাদুরোর প্রভাবশালী সহযোগিরা এখনো নিজ নিজ পদে বহাল আছেন। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তারা রদ্রিগেজকে একজন বাস্তববাদী নেতা হিসেবে দেখছেন যার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব।
এদিকে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলো এই নতুন পরিস্থিতিতে কিছুটা কোণঠাসা বোধ করছে। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেও ট্রাম্প তাকে নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না বলে মন্তব্য করেছেন। তবে মাচাদো দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে তারা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন এবং অবাধ নির্বাচন হলে তারা ৯০ শতাংশ ভোট পাবেন। তিনি দ্রুত দেশে ফিরে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তুলেছেন।
শান্তি স্থাপনের নিদর্শন হিসেবে রদ্রিগেজ সরকার সম্প্রতি বেশ কিছু রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে, যাকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি মোট বন্দির মাত্র ১ শতাংশ। অন্যদিকে, মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্য ও জ্বালানি মজুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যদিও বিদেশে বসবাসরত ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা মাদুরোর কারাবরণকে আনন্দ মিছিল ও উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করছেন।
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ করবে। যদিও এক্সন মবিলের মতো বড় কোম্পানিগুলো আইনি জটিলতা ও নিরাপত্তার অভাবে দেশটিতে বিনিয়োগ করতে এখনো দ্বিধাবোধ করছে। সব মিলিয়ে মাদুরোর পতন হলেও চ্যাভিজমো আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ভেনেজুয়েলাকে এক অজানা গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এখন ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে কে
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিরাপদ ও যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। তবে এই পরিচালনা কীভাবে হবে বা কারা এতে যুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। তিনি বলেন, এটি হবে একটি দলগত প্রচেষ্টা।
ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট তাকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাম ঘোষণা করেছে। ট্রাম্পের দাবি, রোদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র যা চাইবে, তা করতে রাজি হয়েছেন।
তবে পরে রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে মাদুরোর মুক্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার ‘একমাত্র প্রেসিডেন্ট’।
সামনে কী হতে পারে
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় আর কোনও সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা নেই। তবে ট্রাম্প এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, মাঠে সেনা নামাতে আমরা ভয় পাই না। যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় ঢুকে অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।
ট্রাম্পের মতে, মাটি থেকে বিপুল সম্পদ তোলা হবে, যা ভেনেজুয়েলার জনগণ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাজে লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যয় করা অর্থ ফেরত নেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি অন্য দেশগুলোতে তেল বিক্রির কথাও বলেছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলা সরকার এই হামলাকে দেশের ‘কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে তেল ও খনিজ’ দখলের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। সরকারের মতে, এটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভাঙার প্রচেষ্টা। বিশ্বের প্রমাণিত সবচেয়ে বড় তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। তবে দেশটির তেল ভারি ও উচ্চ সালফারযুক্ত, যা পরিশোধন করা তুলনামূলক কঠিন।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন