শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

মন্দিরে মন্দিরে বাজছে দুর্গাপূজার ঘন্টাধ্বনি

মঙ্গলবার, অক্টোবর ১২, ২০২১

প্রিন্ট করুন
pooja 2110041157

নিজস্ব প্রতিবেদক: শঙ্খের আহবানে পূজার ডালা সাজিয়ে, ঘন্টাধ্বনি বাজিয়ে জলন্ত প্রদীপ শিখা সামনে রেখে ভক্তরা প্রণাম জানাচ্ছে দেবী দুর্গাকে। ডাকের সাজ, সোনালী শাড়ি, বাহারি গহনা, কপালে রক্তজবার সিঁদূর, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একচালা চালচিত্রের প্রতিমা, টানা টানা চোখ, সে চোখে লেগে থাকা সূদূর হিমালয় থেকে বাপের বাড়ি আসার আনন্দ। প্রতিমারুপে মন্ডপে মন্ডপে দেবী দুর্গা সুসজ্জিত রুপে প্রস্তুত। দেবী দুর্গাকে প্রণাম করতে ভক্তদের পদচারণায় মূখর মন্দির প্রাঙ্গন। জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে কৈলাশ থেকে নেমে এসেছেন মর্ত্যলোকে। শরতের অকাল বোধনের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠীর দিন থেকে দুর্গাপূজার ঘট বসেছে। ঢাক আর ঢোলের শঙ্খধ্বনিতে মেতে উঠেছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা। 

মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) মহাসপ্তমীতে সকাল থেকে কলাবউ স্নান, পূজা চলবে। এছাড়া দুর্গা দেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনও করা হবে। তাই দেবী পূজার ঘট বসেছে চট্টেশ্বরী মন্দিরে। পাঁচ দিনব্যাপী মণ্ডপে মণ্ডপে চলবে পূজা-অর্চনা, ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান, মহাপ্রসাদ বিতরণ, সন্ধ্যায় আরতি। 

মঙ্গলবার হবে মহাসপ্তমী পূজা। এরপর বুধবার মহাঅষ্টমী ও কুমারী পূজা। বৃহস্পতিবার মহানবমী আর শুক্রবার বিজয়া দশমী। দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দোলায় চড়ে বিদায় নেবেন দেবী দুর্গা।

চট্টেশ্বরী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘মা দুর্গা কৈলাশ থেকে পৃথিবীতে এসেছেন। আমরা তাকে বরণ করে নিয়েছি, শুরু হয়েছে দুর্গা উৎসব। দুর্গা পূজার মাধ্যমে দেশের সকল মানুষের মঙ্গল কামনা করছি। ষষ্ঠী থেকেই ঢাক-ঢোলের বাজনা, কাঁসা, শঙ্খের আওয়াজ এবং ভক্তদের উলুধ্বনিতে দেবী দুর্গাকে পৃথিবীতে স্বাগত জানান ভক্তরা।’

হিন্দু পুরাণ মতে, আশ্বিন মাসের শুক্লাপক্ষে শারদীয়া এবং চৈত্র মাসের শুক্লা পক্ষে বাসন্তি দুর্গাপূজার সময় গণনা করা হতো। আগেকার সময়ে বসন্তকালে জলবসন্ত রোগের প্রকোপ দেখা দিলে রোগ-শোক, অভাব দেখা দিত। সনাতন ধর্ম মতে, যা কিছু দুঃখ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা এসব থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন দেবী দুর্গা। দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন। ফলে তখন থেকেই বাসন্তী পুজো অপেক্ষা শরৎকালের দুর্গোৎসব কালক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।আর সেই থেকে অকালবোধন হওয়া সত্ত্বেও শরৎকালেই দুর্গাপূজা প্রচলন হয়ে যায়।

চিরাচরিত নিয়মানুসারে চট্টেশ্বরী মন্দিরে অষ্টমীর ভোগে চাল বা তা থেকে উৎপন্ন সামগ্রী ব্রাত্যই রাখা হয়। ভোগে নিবেদন করা হয় লুচি, আলু ফুলকপির তরকারি, বাঁধাকপির তরকারি, চাটনি, মিষ্টি এবং ফলফলাদি। পাশাপাশি সপ্তমী থেকেই চলে নৈবেদ্যর ডালি। একবছর পর পর আসা ‘মাহেশ্বরীস্বরূপেণ নারায়ণী’র সমাদরে আয়োজনের বিন্দুমাত্র খামতি রাখেন না চট্টেশ্বরী মন্দিরের সেবায়েতরা।

পূজার সবকটা দিন নৈবেদ্য দেওয়া হয়। তার আয়োজনও বিশাল। সপ্তমীতে ২৩, অষ্টমীতে ৩২, আবার নবমীতে ২৭, এরকম কমবেশি সংখ্যায় দেবী মাকে নৈবেদ্য অর্পণ করা হয়। সকাল থেকে ভোররাত অবধি চলে এই পর্ব। চট্টেশ্বরী মন্দিরের নৈবেদ্য রাঁধুনি বিধান চক্রবর্তী বলেন,’ পঞ্চমী দিন থেকে পূজার দিনক্ষণ শুরু হয়। ষষ্ঠীতে মূল আনুষ্ঠানিকতা। পাঁচদিন ব্যাপী পূজায় সবজি পোলাওসহ দুর্গোৎসবের সকল নৈবেদ্য রান্না করে পূজার্থীদের প্রসাদ দেয়া হয়।’

এরপরে সপ্তমীতে কলাবউ স্নান, অষ্টমীতে একসঙ্গে ‘নারায়ণী নমস্তুতে’ মন্ত্রে অঞ্জলি, পরবর্তীতে সন্ধিপুজো, ১০৮টি প্রদীপে সন্ধিক্ষণকে ধরে রাখার মতো উপাচারে যেন একচালাতেই চলে চট্টেশ্বরী মন্দিরে।

ষষ্ঠীর সকালে চট্টেশ্বরী মন্দিরে পূজা দেখতে আসেন রুপশ্রী দাশ। তিনি বলেন, হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজা। ষষ্ঠী পূজার সকালে মন্দিরে ঠাকুর দেখতে না এলে পূজার আনন্দ অনুভব করা যায় না। মন্ডপে মন্ডপে ঠাকুর দেখে আসি। ষষ্ঠী থেকে দশমীর দিন পর্যন্ত চলে আমাদের আরাধনা। পূজার মাধ্যমে দেবী মায়ের কাছে সব চাওয়া পাওয়ার ডাল সাজাই। ‘

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন বলেন,’ দুর্গাপূজা নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে। যেহেতু এখনও সামান্য হলেও করোনা ভাইরাসের একটা প্রকোপ আছে তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভক্তরা মন্দিরে মন্দিরে যেতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতার ঊর্দ্ধে উঠে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করার বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

গত বছর করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে দুর্গাপূজা ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে অনুষ্ঠিত হলেও এবার সেই বিধিনিষেধ অনেকটা শিথিল করা হচ্ছে।

মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির কর্মকর্তারা বলছেন, এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূজা উদযাপন করা হবে। সারাদেশে এবার ৩২ হাজার ১১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে ২৩৮টি মণ্ডপে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২৭৬টি মণ্ডপে এবং উপজেলায় ১ হাজার ৯৫৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তার দায়িত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকলেও নিজস্ব সেচ্ছাসেবক দল কাজ করবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন