আধুনিক ব্যস্ত জীবনে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসের কাজ, পড়াশোনা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই আমরা চাপের ভেতর দিয়ে যাই। অনেকেই মনে করেন একদিনেই এই চাপ দূর করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে মানসিক চাপ ধীরে ধীরে তৈরি হয়, আর সেটি কাটাতেও সময় লাগে।
মনোবিদরা বলছেন, মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে হলে একটি সুশৃঙ্খল লাইফস্টাইল অনুসরণ করা জরুরি। গবেষণা বলছে, টানা তিন মাস যদি সঠিক নিয়ম মেনে জীবনযাপন করা যায়, তবে মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
মানসিক চাপ কমাতে যা যা করতে হবে
বিশেষজ্ঞের মতামত
ডা. সুব্রত সাহা, কনসালটেন্ট নিউরোথেরাপিস্ট, সম্প্রতি ‘হেলথ ইনসাইডার’-এর একটি পডকাস্টে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর উপায় তুলে ধরেন। তার মতে, জীবনযাপনে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা গেলে তা ধীরে ধীরে আমাদের মনের ভার হালকা করে এবং মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো

দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় পরিবারের জন্য বরাদ্দ রাখা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে কাটালে একদিকে যেমন সম্পর্ক মজবুত হয়, অন্যদিকে মানসিক চাপও অনেকটাই কমে যায়।
যেমন—রাত সাড়ে দশটা থেকে ১২টা পর্যন্ত ফোন-টিভি বন্ধ রেখে পরিবারের সঙ্গে আড্ডা দিন। এ সময়টুকু হালকা মেজাজে গল্প, খাওয়া-দাওয়া বা কোনো খেলা খেলতে পারেন।
পোষ্যের সঙ্গে সময় কাটানো
গবেষণায় দেখা গেছে, পোষ্যের সঙ্গে সময় কাটালে মানুষের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। তাই যদি আপনার পোষা প্রাণী থাকে, প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় তার সঙ্গে খেলুন। এতে মানসিক চাপ কমে এবং এক ধরনের আনন্দ পাওয়া যায়।
সৃজনশীল কাজের অভ্যাস
সৃজনশীল কাজ মানসিক প্রশান্তির অন্যতম বড় উৎস। আঁকাআঁকি, গান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, রান্না করা, বাগান করা বা বই পড়ার মতো কাজগুলো আমাদের মনে ইতিবাচক শক্তি যোগায়। ডা. সাহা পরামর্শ দিয়েছেন, দিনের কাজ শেষে অন্তত ২০-৩০ মিনিট নিজের প্রিয় সৃজনশীল কাজে ব্যয় করতে। এতে একঘেয়েমি দূর হবে এবং মানসিক চাপ হ্রাস পাবে।
পর্যাপ্ত ঘুম

যত ব্যস্ততাই থাকুক, পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়া শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রতিদিন অন্তত ৬-৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ঘুমের সময় শরীর শুধু বিশ্রামই নেয় না, বরং মস্তিষ্ক নতুন উদ্যমে কাজ করার শক্তি সঞ্চয় করে। কম ঘুম স্ট্রেস বাড়ায়, বিরক্তি সৃষ্টি করে এবং মনোযোগ কমিয়ে দেয়।
হাঁটার অভ্যাস

প্রতিদিন সকালে হালকা হাঁটা শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। সকালে সম্ভব না হলে সন্ধ্যায় হাঁটতে পারেন। হাঁটার ফলে রক্তসঞ্চালন ভালো হয়, শরীরে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয় যা প্রাকৃতিকভাবে মন ভালো রাখে। প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিটের হাঁটা ধীরে ধীরে মানসিক চাপ দূর করতে কার্যকর।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস
খাবারের সঠিক নিয়ম মেনে চলাও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। হেভি ব্রেকফাস্ট, হালকা লাঞ্চ এবং সবচেয়ে হালকা ডিনারের অভ্যাস তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে রাত ৮টার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়া উচিত। এতে হজম ভালো হয়, ঘুমের মান উন্নত হয় এবং শরীরও সতেজ থাকে।
তিন মাসের পরিবর্তনে ইতিবাচক ফল
ডা. সুব্রত সাহার মতে, উপরোক্ত নিয়মগুলো যদি নিয়মিত তিন মাস ধরে অনুসরণ করা যায়, তাহলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে আসবে। শুধু তাই নয়, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়বে, ঘুমের মান উন্নত হবে এবং মানসিকভাবে প্রশান্ত থাকা যাবে।
শেষ কথা
মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে কোনো যাদুকরী সমাধান নেই। তবে ছোট ছোট অভ্যাসে পরিবর্তন আনলেই ধীরে ধীরে স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে আসবে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সৃজনশীল কাজে মন দেওয়া, নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস—এই কয়েকটি অভ্যাস তিন মাস ধরে বজায় রাখতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন