সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বেইজিং সফর বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চলতি মাসের শেষের দিকে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের সম্ভাব্য চীন সফর এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে যে, পশ্চিমা শক্তিগুলো হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বেরিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক মেরুকরণ নয়, বরং চরম বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক কৌশল বা ‘ক্যালকুলেটেড হিপোক্রেসি’।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দাভোস সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি ‘ফাটল’ বা ‘বিচ্যুতির’ কথা উল্লেখ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্য যুদ্ধ এবং মিত্রদের প্রতি জবরদস্তিমূলক আচরণ অনেক পশ্চিমা দেশকে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। একে কার্নি ‘তৃতীয় পথ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে মাঝারি শক্তির দেশগুলো জ্বালানি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিশ্চিত করতে চায়। অর্থাৎ, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা বজায় রেখেই চীনের সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে আগ্রহী।
এই ভারসাম্য রক্ষার লড়াইয়ের পেছনে কাজ করছে এক গভীর সভ্যতাগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন। নিবন্ধকার জিয়াং-এর মতে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য চীন সফর মানেই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা ত্যাগ করা নয়। নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, বিশেষ করে ‘ফাইভ আইজ’ নেটওয়ার্ক এবং ন্যাটোর কাঠামোগত সংহতি এমন এক ভিত্তি তৈরি করেছে যা চীনের ‘চেকবুক ডিপ্লোম্যাসি’ বা আর্থিক কূটনীতি দিয়ে ভাঙা সম্ভব নয়।
উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তার খাতিরে ডারউইন বন্দর পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করেছে।
জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় মিত্রদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। তাদের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য সত্ত্বেও তারা ওয়াশিংটনের সাথে সামরিক সমন্বয় আরও জোরদার করছে। পশ্চিমা নেতাদের এই দ্বিমুখী আচরণকে নিবন্ধে ‘হিসাব কষা ভণ্ডামি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—যেখানে তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জবরদস্তির সমালোচনা করলেও আড়ালে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার নিচেই আশ্রয় খোঁজেন।
পরিশেষে, বেইজিং সফরগুলো মূলত ওয়াশিংটনের একপাক্ষিক নীতির বিরুদ্ধে একটি বার্তা হলেও এটি কোনো বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। পশ্চিমা দেশগুলো এখন একটি বিপজ্জনক ভারসাম্য রক্ষার খেলা খেলছে—যেখানে চীন থেকে সমৃদ্ধি অর্জন করা লক্ষ্য, কিন্তু টিকে থাকার জন্য তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই নির্ভর করছে।
এই ‘তৃতীয় পথ’ কতটা স্থিতিশীল হবে, তা নির্ভর করবে সামনের দিনগুলোতে মহাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতার তীব্রতার ওপর।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন