ঢাকা: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নব নির্বাচিত সভাপতি কমরেড মো. শাহআলম চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সাথে মত বিনিময় করেছেন। সভায় তিনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ২৮ মার্চ বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকা হরতালে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাখানের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘হরতাল আমরা বামপন্থীরা ডেকেছি। বিএনপির সমর্থন তো আমরা চাইনি। বিএনপির রাজনীতি বিএনপি করুক। বিএনপির কোমরে জোর থাকলে সে আলাদাভাবে করুক। আমরা হরতালে তাদের সমর্থন চাইনি।’
রোববার (১৩ মার্চ) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে আয়াজিত সভায় শাহআলম আরো বলেন, ‘বিএনপি হরতালে সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু বিএনপি কি মুক্তবাজারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? বিএনপি কি রেশনশপ চালু করার পক্ষে থাকবে? গণবন্টন ব্যবস্থার পক্ষে থাকবে? শিক্ষা-স্বাস্থ্য সরকারিকরণের পক্ষে থাকবে? বিএনপি নিজেই মুক্তবাজারপন্থী। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে শ্রেণিগত কোন পার্থক্য নেই, ওরা মুক্তবাজারে বিশ্বাস করে। আমাদের হরতাল মানুষের জান বাঁচানোর জন্য। যারা এখানে ঢুকে যেতে চান, তাদের হুঁশিয়ার করছি। আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই, কারও ক্ষমতার খেলার হাতিয়ার আমরা হব না, এটা পরিস্কার থাকা দরকার। বিএনপির রাজনীতি বিএনপি করুক। আগেই বলেছি, আমরা কারো ক্ষমতায় যাওয়ার বাহন হব না, কাউকে ক্ষমতায় রাখতেও চাই না। আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই। আমাদের এ রাজনীতিকে যারা ভণ্ডুল করতে চাচ্ছে, তাদের হুঁশিয়ার করতে চাই।’
হরতালে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠে আছি, থাকব। মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে আমাদের লাভ নেই। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। ৬৮, ৮৩ ও ৮৭ সালে জেল খেটেছি। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। কমিউনিস্টদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। অনেক ভয় দেখিয়েছেন, তারপরও তো কমিউনিস্টরা লড়াই করছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা দুনিয়ায় লড়াই করছে। আমরা যেমন দেশপ্রেমিক, আমরা তেমনি আন্তর্জাতিকতাবাদী। আমরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব ও তাদের দোসর এ দেশে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে আছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। এটা ফরজ কাজ। এদেশের মেহনতী মানুষের জন্য আমরা এ ফরজ কাজ করে যাব। হামলা-মামলা, চোখ রাঙানি, মাস্তানি, আক্রমণ ওগুলো আমরা পরোয়া করি না। মাস্তানি আমরা ৬৯ সালেও দেখেছি, জনতার বুলডোজারে মাস্তানি কর্পুরের মত উড়ে গিয়েছিল। জনগণের বুলডোজারে মাস্তানরা পড়ে যাবে। এরশাদের সময় অভি-নীরুরা জনগণের বুলডোজারে পড়ে টিকতে পারেনি। এখনো টিকতে পারবেন না, যতই নিজেকে সাজাক।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে ক্ষমতায়ও রাখতে চাই না। আমরা কারো ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার হব না। আমরা আর পরগাছাবৃত্তি করব না। বিএনপি যদি গাছ হয়, আওয়ামী লীগ যদি গাছ হয়, তাহলে সেখানে পরগাছার ভূমিকা আমরা আর নেব না। আমরা বিকল্প গড়তে চাই, ক্ষমতায় যেতে চাই। আমরা ব্যবস্থা বদল করতে চাই। প্রকৃত গণতন্ত্র কায়েম করতে চাই। এ নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। গোটা বাংলাদেশে আমাদের পার্টি নেমে গেছে।’
নব গঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শাহআলম বলেন, ‘এ নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর হাতের পুতুল হয়েই থাকবে। আর যে আইনটা হয়েছে, এটা একটা কালো আইন। হাসিনার ক্ষমতা তো চিরস্থায়ী হবে না, কিন্তু স্বৈরশাসক যারাই আসবে, বিশেষ করে সামরিক স্বৈরশাসকদের জন্য এটা পোয়াবারো হয়ে গেছে। কারণ নির্বাহী প্রধানই তো নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবেন। এটা ৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইনের মত কালো আইন হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার ছিনতাই হয়ে গেছে। এ আইন বাতিল করে জনগণের ভোটের অধিকার ফেরাতে ফের দেশের জনগণকে রক্ত দিতে হবে।’
আগামী সংসদ নির্বাচনে সিপিবি অংশ নিচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বামজোট গতবার নির্বাচনে গিয়েছিল। ১৩৪টি আসনে আমরা সম্মিলিতভাবে প্রার্থী দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনটা হয়নি। পরের দিনের ভোট আগের দিন রাতে হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ এক সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিল, সেই গণতন্ত্র তারা গিলে খেয়ে নিল। বিএনপির জন্ম গ্যারিসনে, রাস্তা থেকে নয় অথচ আওয়ামী লীগের জন্ম রাস্তা থেকে, অথচ তারাই গণতন্ত্র গিলে খেল। মানুষ যদি গণআন্দোলনে নেমে যায়, আমরা ভোটে যাব কেন? গণআন্দোলন করে রেজিম পরিবর্তন করে তারপর ভোটে যাব। মানুষ যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে আমরা ভোটে যাব। ভোটের কেন্দ্র পাহারা দিয়ে জনগণের ভোটের অধিকার কায়েম করতে হবে।’
বাংলাদেশকে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আজ শেখ মুজিবের আদর্শের বিপরীতে কাজ করছে। লুটেরা রাজনীতিবিদ, লুটেরা ব্যবসায়ী, সামরিক-বেসামরিক আমলারা আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চরিত্র চুষে খেয়ে ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি থেকে তারা দূরে সরে গেছে। মুক্তবাজার জিয়াউর রহমান করেছিল, এরশাদ সেটাকে সংহত করেছিল আর আওয়ামী লীগ সেটাতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গেছে। এর থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। এ বাংলাদেশ কারো বাপের তালুকদারি না। উত্তরাধিকারের রাজনীতি বাংলাদেশকে শেষ করে দিয়েছে। উত্তরাধিকারের রাজনীতি মানে অগণতান্ত্রিক রাজনীতি। যে যেখানে সাংসদ, তিনি তার ছেলেকে সাংসদ বানানোর জন্য সামনে নিয়ে আসছে। এটা কি জনগণের রাজনীতি? এটার নাম রাজনীতি?
এ সময় চট্টগ্রাম জেলা সিপিবির সভাপতি অশোক সাহা ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, দক্ষিণ জেলা সিপিবির সভাপতি কানাইলাল দাশ ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী ও সিপিবি নেতা উত্তম চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, মছিউদ্দৌলা, সিতারা শামীম, সেহাবউদ্দিন সাইফু, ফরিদুল ইসলাম, অমিতাভ সেন উপস্থিত ছিলেন।
সিএন/এমএ



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন