চলমান ডেস্ক:
নিউইয়র্কে বয়স্ক বা অসুস্থ মা বাবা অথবা আত্নীয় স্বজনকে দেখ ভাল করার জন্য সেবাদান কারীকে হেলথ ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক বেতন নির্ধারিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট হোমকেয়ার কোম্পানী গুলো তা মানছে না। যে যার মত করে রেইট নির্ধারণ করে রোগীকে স্ব স্ব কোম্পানীতে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এতে করে হোমকেয়ার মালিকদের মধ্যে অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে বলে জানা গেছে। ফলে রোগী এবং সেবাদানকারী দুজনই ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন বলে হোমকেয়ার মাঠ কর্মীরা জানিয়েছেন।
হোমকেয়ার সার্ভিসে অতিরিক্ত টাকা প্রাপ্তির প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তারা জানিয়েছেন, অধিক বেতন দেয়ার নাম করে একটি প্রতারণার ফাঁদ হোমকেয়ার সার্ভিসে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মনিটর করা শুরু হয়েছে। তারা হোমকেয়ার সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রতারণার বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খুঁটিয়ে দেখছে এবং এরই অংশ হিসাবে এফবিআই ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর হোমকেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে।
ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ-এর ওয়েবসাইট উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্ট এই সূত্র থেকে বলা হয়েছে, সরকার ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর এক নীতিমালায় হোমকেয়ার সেবাদানকারীদের বেতন ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ঘন্টাপ্রতি ১৯ ডলার ৯ সেন্ট নির্ধারণ করে দিয়েছে। চলতি এই ২০২১ সালেও এই একই রেট বলবৎ রয়েছে। কিন্তু এই নিয়ম-নীতির পরোয়া না করে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ঘন্টাপ্রতি ২১ থেকে ২৩ ডলার পর্যন্ত বেতন দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করে যাচ্ছে।
এ ধরনের প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করে সূত্রটি জানান, বেশি টাকা বেতনের অফার সংবলিত কোন প্রকার বিজ্ঞাপন, এমনকি ফ্লায়ার দেয়াও সরকারের হোমকেয়ার নীতিমালায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিধান করা হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ-এর নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, বেতন উল্লেখ করে কোনরূপ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না। এটা নিষিদ্ধ এবং এই অপরাধে হোমকেয়ারের লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল হতে পারে।
এই সূত্র থেকে জানান হয়েছে, এ ধরনের অনিয়মের বিষয়টি সরকারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সরকারের বাজেটের একটি বড় অংশ এই হোমকেয়ারের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বিশেষ করে এমএলটিসি একযোগে ওএমআইজি (অফিস অফ ইন্সপেক্টর জেনারেল), ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ, মেডিকেইড প্রভৃতি সংস্থার সাথে কাজ শুরু করেছে হোমকেয়ারগুলির অনিয়ম, প্রতারণা ও দূর্নীতি খুঁজে বের করতে।
সূত্রটি জানিয়েছেন, নিউইয়র্ক স্টেটের ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ-এর মেডিকেইড দ্বারা পরিচালিত হোমকেয়ার সার্ভিস ক্রমে ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এর বাজেট ২০১৩ সালের তুলনায় ২০২০ সালে তিনগুন বৃদ্ধি পায়। এর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। বহু সংখ্যক কোম্পানি এখন এই ব্যবসায়ে নেমেছেএবং ঘরে ঘরে তাদের সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশি মালিকানাধীন সাতটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এদের ওপর সরকারের নজরদারিও বেড়ে গেছে। হোমকেয়ারের লোভনীয় বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে তাদের নজরদারি কঠোর হয়েছে। সরকার নির্ধারিত রেটের থেকে বেশি বেতন দেয়ার কথা যারা বলছে তাদের কার্যকলাপে সরকারি সংস্থাগুলি প্রতারণার আশঙ্কাও করছেন।
কোম্পানিগুলি সরকারকে সব ট্যাক্স যথাযথ পরিশোধ করছে কিনা সে ব্যাপারে সরকারি সংস্থাগুলি সন্দিহান। কারণ ফেডারেল, স্টেট, সিটি, মেডিকেয়ার, প্রভৃতি সব মিলিয়ে বেতনের ২৪ থেকে ২৮ শতাংশ ফি বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে দিতে হয়। তারা মনে করেন, ট্যাক্স ফাঁকি কিংবা সরকারি ফি কোষাগারে না দিয়েই শুধু সেবাদানকারীদের বেশি অর্থ প্রদান করা সম্ভব। ঘন্টায় ২১ থেকে ২৩ ডলার বেতন দেয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তার সাথে ২৫ শতাংশ সরকারি ট্যাক্স যোগ করলে দাঁড়ায় ঘন্টায় ২৯ ডলার। এই পরিমাণ ব্যয় বহন করা হোমকেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলির পক্ষে একরকম অসম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল।
আশঙ্কা প্রকাশ করে এই সূত্র থেকে বলা হয়েছে, কোথাও কোন অনিয়ম ধরা পড়লে তার দায়ভার বহন করতে হবে সেবা গ্রহণকারী রোগীদেরও। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী হোমকেয়ার সেবাটি ‘কনজ্যুমার ডাইরেক্টেড প্রোগ্রাম’, যার দায়ভার রোগীকেও নিতে হয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশি পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ইমিগ্রান্ট এলডার হোমকেয়ার এলএলসি’র প্রেসিডেন্ট ও সিইও গিয়াস আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, অনিয়ম বা প্রতারণার কোন অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অবশ্যই জরুরি। ব্যবসায়িক সততার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, কেউ যদি সব রকমের ট্যাক্স-ফি পরিশোধ করে সেবাদানকারীদের বেশি বেতন দিতে পারে তবে তাতে অপরাধের কিছু আছে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, বেশি বেতনের অফার দিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া নিষিদ্ধ এমন কোন সরকারি নীতি সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। এটা যদি নীতিবিরোধী হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সবাইকে নোটিশ দিয়ে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া। তিনি আরো বলেন হোমকেয়ার গ্রহীতাদেরও লোভ সংবরন করা উচিত। কারণ বিপদে পড়লে সবাই এক সাথে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মার্কস হোমকেয়ারের আলমাস আলী বলেন, হোমকেয়ার সার্ভিস একটি ব্যবসা। বিভিন্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর সাথে বিভিন্ন শর্তে এই ব্যবসা করতে হয়। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলি বিভিন্ন ধরনের রেট দিয়ে থাকে। সেখানে বেতনের হার কম-বেশি হতে পারে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত হার মেনেই বেতন নির্ধারিত হতে হবে। তিনি বলেন, বেতনের হার উল্লেখ করে বিজ্ঞাপন কিংবা পোস্টার করা নিষিদ্ধ। এটা মেনে চলা উচিত। অনেক সংস্থাই এমন বেতন অফার করছে যা বাস্তবায়ন করা খুব সহজ নয়। হয়ত এ সব কোম্পানী নিজেদের ক্ষতি স্বীকার করেই এটি করছে।
আলমাস আলী বলেন, কোন অনিয়ম বা প্রতারণা কোথাও হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবশ্যই নেয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রতি বছর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি হোমকেয়ার কোম্পানীগুলির হিসাব-নিকাশ তদারক করে, নিয়মিত অডিট করে। করোনার কারণে গত দুই বছর এটি বন্ধ আছে। এই কার্যক্রম আবার শুরু হলেই তারা জানতে পারবে কোন কোম্পানীর অবস্থা কেমন।
তিনি বলেন, যারা হোমকেয়ারের সেবা গ্রহণ করেন তারা যাতে চটকদার প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হন সে ব্যাপারে কোম্পানী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত। তিনি আরো বলেন, বেশী রেট দিলে কেউ যদি তার গ্রাহক সহ কোম্পানী বিক্রি করতে চান তাহলে গ্রহীতা তার কোম্পানী কিনতে আগ্রহী হবেনা। কারণ কোম্পানীর ক্রেতা বেশী রেট দেয়ার কারণে লাভবান হতে পারবেনা। এসনসিয়াল হোমকেয়ারের সিইও মোহাম্মদ হোসেন ইশতিয়াক বলেন, মার্কেটে অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে। রেট নিয়ে হেলথ ডিপার্টমেন্টের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। বিজ্ঞাপন দেখে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বারি হোমকেয়ারের সিইও আসেফ বারী টুটুল বলেন, ফেডারেলকে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। রেট বিষয়ে বলেন, আমরা একটু লাভ কম করে গ্রাহককে লাভবান করছি। এতে কোন ক্ষতির কারণ আমি দেখিনা। এফবিআইয়ের নজরদারি ও গ্রেফতার প্রসঙ্গে বলেন, একটি হোমকেয়ার মৃত ব্যক্তির নামে বিল করে ডলার উঠিয়েছে তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যে কেউ অন্যায় করলে তার সাজা হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে হোমকেয়ার মালিকরা সবাই এক হয়ে কাজ করতে পারলে গ্রাহক এবং মালিকরা সবাই লাভবান হতো এবং অস্থিরতা থাকতো না।
এম এন্ড এন হোমকেয়ারের সিইও সামিউল চৌধুরী বলেন, আমি যখন কোন ব্যবসা করবো,সব কিছু জেনে শুনেই করব। নিয়ম মেনে আমরা রেট দিচ্ছি। কারো কোন বক্তব্য থাকলে সরাসরি তাদের অফিসে কল করার পরামর্শ দেন তিনি।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন