যুক্তরাষ্ট্র এবার প্রকাশ্যভাবে ভারতকে সামনে রেখে বড় কূটনৈতিক পরিকল্পনার পথে হাঁটছে। চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের নতুন কৌশলের কেন্দ্রে উঠে এসেছে নয়াদিল্লি। সেই লক্ষ্যেই আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতকেন্দ্রিক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য শুনানি আয়োজন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশন। এটি ২০২৬ সালের কমিশনের প্রথম জনসমক্ষে শুনানি।
বিপক্ষীয় এই কংগ্রেসীয় সংস্থা জানিয়েছে ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও চীন সম্পর্ক এবং ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য। ওয়াশিংটনের চোখে ভারত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয় বরং চীন মোকাবিলায় কৌশলগত অংশীদার।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এই শুনানিতে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হবে। এর মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ভারত মহাসাগরে নৌ চলাচলের অধিকার এবং ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও পর্যালোচনা করা হবে। শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক বিষয় নয় এই শুনানিতে উঠে আসবে ভারত চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের নানা দিক। বাণিজ্য বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেমিকন্ডাক্টর এবং ওষুধ সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভারতের আত্মনির্ভরতার প্রচেষ্টা কীভাবে চীনের প্রভাব কমাতে পারে তা নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে ওয়াশিংটন। কমিশন জানিয়েছে ভারত ও চীনের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে সেটিও এই শুনানিতে মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ নয়াদিল্লি এবং বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা বা দূরত্ব ওয়াশিংটনের কৌশলে কতটা প্রভাব ফেলছে তা খতিয়ে দেখা হবে।
এই শুনানির সময় নির্বাচনও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ চার বছর ধরে গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষের পর ভারত চীন সম্পর্ক ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পথে। উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক সফর এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ আবার শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ায় ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হয়। এরপর সাত বছরেরও বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রী মোদীর চীন সফর সেই সম্পর্ককে নতুন গতি দেয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যে পাঁচ বছর বন্ধ থাকা বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ভারত সরকার চীনা সংস্থাগুলোর জন্য বিনিয়োগ এবং সরকারি প্রকল্পে অংশগ্রহণের দরজা ধীরে ধীরে খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এই খুলে দেওয়া প্রক্রিয়াকে গ্রেডেড বা ধাপে ধাপে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নয়াদিল্লির তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে বেইজিংকেও কিছু শর্ত মানতে হবে। সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক আস্থার বিষয়টি এতে বড় ভূমিকা রাখবে। এই অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলবিদদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
কারণ গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতের ওপর বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। সামরিক সহযোগিতা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে ওয়াশিংটন। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত চীনের প্রভাব সীমিত রাখতে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এই শুনানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর। আগামী এপ্রিল ২০২৬ এ ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাওয়ার কথা রয়েছে। কোভিড মহামারির সময় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
তিনি জানিয়েছেন, চীন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন কিনছে যা অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নতির ইঙ্গিত। তবে এই সম্পর্ক উন্নতির মধ্যেই চীনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে ভারতকে সামনে রেখে কৌশল সাজাচ্ছে ওয়াশিংটন। এই পুরো প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ সালে কংগ্রেসের মাধ্যমে গঠিত এই কমিশনের কাজ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জাতীয় নিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা খতিয়ে দেখা। কমিশনের পর্যবেক্ষণ এবং সুপারিশ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলে। এবার সেই কমিশনের আলোচনার কেন্দ্রে ভারত উঠে আসায় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শুনানি আসলে চীনকে একটি কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ভারতকেও সতর্ক করে দেওয়ার চেষ্টা। বার্তাটি হলো নয়াদিল্লি যদি বেইজিংয়ের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে তাহলে তার প্রভাব ওয়াশিংটন দিল্লি সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত চীন যুক্তরাষ্ট্রের এই সমীকরণ পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি নিরাপত্তা এবং কূটনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফেব্রুয়ারির শুনানি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী নীতিগত অবস্থান কী হয় এবং ভারত সেই অবস্থানের প্রতি কীভাবে সাড়া দেয় সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন