যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই গুঞ্জন চলছিল ইরানের শীর্ষ পদটি নিয়ে। অন্তর্বর্তীও নিয়োগ দিয়েছিল ইরান। এবার আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ৫৬ বছর বয়সি মোজতবা খামেনিকে কখনোই কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যায়নি। এমনকি কোনো জনমতের মুখোমুখিও হননি। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসনের মাঝে তাকেই সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিতে হলো।
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুদ্ধের প্রথম দিনে তেহরানে খামেনি পরিবারের বাসভবনে চালানো ভয়াবহ হামলায় নিহত হন মোজতবা খামেনির বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। প্রাণ হারান মোজতবা খামেনির মা, স্ত্রী ও এক বোনও। বাড়িতে না থাকায় বেঁচে যান মোজতবা।
কে এই মোজতবা
৫৬ বছর বয়সি মোজতবা খামেনি ইরানের শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী কিন্তু আড়ালে থাকা ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবা বেড়ে ওঠেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের সময়ে। তার বাবা, তখনকার প্রভাবশালী আলেম, শাহের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বারবার গ্রেফতার ও নির্বাসিত হন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর পরিবারের অবস্থান পালটে গেলে মোজতবা তেহরানে চলে আসেন। সেখানে তিনি এলিট আলাভি হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। এটি শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তৈরির জন্য পরিচিত। পরবর্তীতে তেহরান ও কুমে ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং রক্ষণশীল আলেম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ-তাকি মেসবাহ ইয়াজদি-সহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির অধীনে পড়াশোনা করেন বলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ইউএএনআই জানিয়েছে।
মোজতবা একজন মধ্যম-স্তরের আলেম, তবে তিনি আয়াতুল্লাহ নন। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম লিডারের দপ্তরে আড়ালের শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।
বিশ্লেষকেরা প্রায়ই তার ভূমিকাকে আহমদ খোমেনির সঙ্গে তুলনা করেন, যিনি তার বাবা রুহুল্লাহ খোমেনির শাসনামলে প্রধান আস্থাভাজন ও গেটকিপার হিসেবে কাজ করেছিলেন।
মোজতবার প্রভাবের পেছনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি হাবিব ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে গোয়েন্দা ও বাসিজ কমান্ডারসহ নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ে ওঠা ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিদেশি সরকারগুলো তাকে নির্বাচন রাজনীতি ও নিরাপত্তা দমনপীড়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় মার্কিন ট্রেজারি জানায়, আলী খামেনি তার কিছু ক্ষমতা ছেলের কাছে ন্যস্ত করেছিলেন এবং নির্বাচিত পদে না থাকলেও তিনি আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করতেন।
তবে তার উত্তরসূরি হওয়া সহজ ছিল না। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সুপ্রিম লিডার হতে হলে উচ্চপদস্থ ধর্মীয় আলেম এবং স্বীকৃত ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার অধিকারী হতে হয়। মোজতবা বর্তমানে আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা ধারণ করেন না। তা ছাড়া বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাবা থেকে ছেলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর একটি সংবেদনশীল বিষয়।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসই পরবর্তী সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করে থাকে। সংস্থাটি যোগ্য আলেমদের মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মানদণ্ড পূরণকারী একজনকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সংবিধান প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের ব্যবস্থারও অনুমতি দেয়, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাহী কর্তৃত্ব অব্যাহত থাকে।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন