ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ১৯৪৮ সালে গড়ে তোলা ইসরাইল জন্মের পর একাধিকবার মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধ-সংঘাতে জড়িয়েছে। জয়-পরাজয় যা-ই হোক না কেন, ভূমি ছাড়ার দৃশ্য বা নিজেদের মধ্যে অনৈক্য কখনও দেখেনি তেল আবিব। কিন্তু, ২০২৩ সালে হামাসের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ইহুদিদের ভীত কাঁপিয়ে দেয়। ধ্বংস হওয়ার ডর পয়দা হয়েছে তাদের অন্তরে।
এরপর টানা দু’বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ইসরাইলি নৃশংস গণহত্যাও ‘ব্যাক ফায়ার’ করেছে। সেই থেকে অবৈধ এ ভূখণ্ড ছাড়তে ইহুদিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ঢল নামে সীমান্ত এলাকা ও বিমানবন্দরগুলোতে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ইরানে যৌথ আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল। এতে বেশ ক্ষুব্ধ খোদ ইসরাইলিরাই।
যুদ্ধের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন-ইসরাইলি ভয়াবহ হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইরানের। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সরকার ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক নেতার মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যাও দুই হাজার ছুঁই ছুঁই। এছাড়া সামরিক ও বেসামরিক হাজার হাজার অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয়েছে, কিন্তু হাল ছাড়েনি ইরানিরা।
ধীরে ধীরে বিদ্রোহী হয়ে উঠছে সাধারণ নাগরিকরা। সর্বশেষ গত ৩ এপ্রিল ইরানে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে; যেখানে উপজাতি নারীদেরও বন্দুক হাতে মার্কিন পাইলটকে খুঁজতে দেখা যায়। এই দৃশ্য ইরানিদের যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাট্টা ও প্রতিবাদী হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।
অপরদিকে ইসরাইলের চিত্র পুরোপুরি উলটো। ইরানের রেজিম চেঞ্জ বা শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য আগ্রাসন শুরু করলেও সরকারবিরোধী আন্দোলন হচ্ছে ইসরাইলে। দফায় দফায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পদত্যাগ, যুদ্ধবন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় নামছে ইসরাইলিরা।
সর্বশেষ শনিবার (৪ এপ্রিল) যুদ্ধবিরোধী ব্যানার বহন করে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তেল আবিবে শত শত ইসরাইলি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে গণজমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে জড়ো হন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: ‘বোমা নয়—আলোচনা করুন! অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করুন!’
ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি তৃণমূল গোষ্ঠী ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’-এর সহ-পরিচালক অ্যালন-লি গ্রিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা এখানে ইরান, লেবানন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে গণহত্যা বা পরিকল্পিত আক্রমণ বন্ধের দাবি জানাতে এসেছি।’
গ্রিন বলেন, ‘ইসরাইলে সবসময়ই যুদ্ধ লেগে থাকে। তাই যদি আমাদের বিক্ষোভ করতে দেওয়া না হয়, তবে আমাদের কখনোই কথা বলতে দেওয়া হবে না।’
এর আগে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, যুদ্ধ অবসানের দাবিতে গত ২৮ মার্চও ইসরাইলজুড়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সমাবেশ করেছে। তেল আবিব, হাইফা ও জেরুজালেমে এ প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা জানান, চলমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি সত্ত্বেও তারা ‘জীবনের জন্য’ এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এবং যুদ্ধকালীন সরকারি নীতির তীব্র বিরোধিতা করছেন।
ইসরাইলিরা কেন রাস্তায় নামছেন
ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ইসরাইলিদের। ক্রমেই বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। জ্বালানির মূল্য, খাবারের দাম, পরিবহণ খরচ-সবই বেড়েছে। সঙ্গে বিঘ্ন ঘটছে বাণিজ্যে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচতে ইসরাইলিদের দিন-রাতের অধিকাংশ সময় থাকতে হচ্ছে বাঙ্কারে, যা তাদের উৎপাদন কমিয়ে ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যেকোনো একটি শহরে ছোট্ট একটি ড্রোন বা একটি রকেট আঘাত হানলে সর্বোচ্চ ক্ষতি হতে পারে একটি ফ্ল্যাটের বা কোনো একটি দোকানের। কিন্তু, আকাশে সেই বস্তুর আগমন শনাক্ত হওয়ার পর যে সাইরেন বাজে তাতে একটি শহরের সব বাসিন্দাকে পালাতে হয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে এ লুকোচুরি খেলা খেলতে গিয়ে তাদের জীবন নাজেহাল হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে কমছে আয়। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও কাজ করতে না পারায় কমে যাচ্ছে ইসরাইলিদের আয়। এর বিপরীতে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। এছাড়া যুদ্ধ চালাতে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে ইসলাইলের ৩০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে, যা তাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি করছে। এতে কমে যাচ্ছে মুদ্রার মানও।
এসব কারণে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে ইসরাইলিরা। ঘরের মধ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় মৃত্যুর চেয়ে তারা রাস্তায় প্রতিবাদ করে জীবন দিতে চায়, তাই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে যাচ্ছে। এছাড়া তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, ডুবে যাচ্ছে হতাশার সাগরে।
জন্মভূমি ছাড়ছে ইসরাইলিরা
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গাজা সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মাঝে ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ১ লাখ ইসরাইলি দেশত্যাগ করেছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ ইসরাইলের মোট নাগরিকের সংখ্যা মাত্র এক কোটি। এরও আবার অনেকে অন্য দেশে থাকে।
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকায় তারা দেশে ছাড়ছেন। এছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কর্মের সন্ধানেও ছুটছে কেউ কেউ। এসব কারণে উচ্চ দক্ষ পেশাদাররা আর যুদ্ধ পরিস্থিতির ভার সইতে চাইছে না।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ধাক্কা—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত—অভিবাসনের মাত্রায় একটি তীব্র ও আকস্মিক উল্লম্ফন ঘটাতে পারে। এই প্রবণতা ইসরাইলের জন্য একটি অত্যন্ত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
এই পরিস্থিতিতে আরও প্রকট করে তুলেছে ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণগুলো। কারণ, ধীরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকানোর সক্ষমতা কমে আসছে ইসরাইলের, যা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পালাতে পারে ঝাঁকে ঝাঁকে ইসরাইলি।
মিশর সীমান্ত এখন ইসরাইলিদের পালানোর পথ
যুগ যুগ ধরে ইসরাইলি আক্রমণ থেকে বাঁচতে মিশর সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছেন ফিলিস্তিনি মুসলিমরা। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত বছর হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গণহত্যার মাত্রা কমিয়েছে ইসরাইল, যাতে মিশর সীমান্তে জন্মভূমিতে ফেরা ফিলিস্তিনিদের ঢল নেমেছে। বিপরীতে, এই পথে এখন পালাচ্ছে ইসরাইলিরা।
জেরুসালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর ইসরাইল জুড়ে মানুষের ফোনে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। এক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে। আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরে কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করছিল না। কিন্তু, সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় নাগরিক ও পর্যটকরা এই ভূমি ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠে।
২ মার্চ ইসরাইলি পর্যটন মন্ত্রণালয় তাবা সীমান্ত পারাপারের জন্য শাটল সার্ভিস পরিচালনা শুরু করেছে। এভাবেই মিশরের তাবা ও ইসরাইলের আইলাতের মধ্যে অবস্থিত এ ক্রসিং ইসরাইলিদের পালানোর পথে পরিণত হয়।
ইসরাইলের উলটো দাবি
ইরানে আক্রমণ শুরু করার পর ইসরাইলিদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকায় জন্মভূমি ছাড়া ও প্রতিবাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দিলেও তেল আবিব দিচ্ছে উলটো তথ্য। ইসরাইলি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সূত্র দিয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর ২০ হাজারের মতো ইহুদি ইসরাইলে ফিরেছে।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন