বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

শিরোনাম

পাকিস্তানে তিন শতাধিক শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

পাকিস্তানের আট বছরের শিশু মোহাম্মদ আমিনের মৃত্যুর দৃশ্য আজও তার মা’র মনে গেঁথে আছে। তীব্র জ্বরে কাতর আমিন বৃষ্টিতে গিয়ে শুয়ে থাকতে চাইত, যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা আমিনের মৃত্যুর ঠিক আগে জানা যায়, সে এইচআইভি আক্রান্ত। অবাক বিষয় তার পরিবারের অন্য কারও এই রোগ নেই।

আমিনের ১০ বছর বয়সি বোন আসমাও এখন একই ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে। ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সে মৃত ভাইয়ের কথা মনে করে চোখের পানি ফেলে। পাকিস্তানের তৌনসা শহরে এমন করুণ গল্প এখন শত শত পরিবারের।

কারণটাও বেশ অবাক করার মতো। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সেখানে অন্তত ৩৩১ জন শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে এবং অনেকে মারাও গিয়েছে।

এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তৌনসার তহসিল হেডকোয়ার্টার হাসপাতাল থেকেই এই সংক্রমণের সূত্রপাত হতে পারে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতির কথা বললেও গোপন পর্যবেক্ষণে ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়ে। দেখা যায়, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ আবার ব্যবহার করে ওষুধ নেওয়া হচ্ছে, ফলে ওষুধের শিশিতে জীবাণু মিশে যাচ্ছে এবং তা থেকে অন্য শিশুদের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে।

এছাড়া একই ভায়াল থেকে একাধিক শিশুকে ইনজেকশন দেওয়া, গ্লাভস ছাড়া রোগী স্পর্শ করা, এমনকি জামার ওপর দিয়েই সুঁই ফোটানোর মতো ঘটনাও বারবার দেখা গেছে। ব্যবহৃত সুঁই-সিরিঞ্জও অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হচ্ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনিয়ম সরাসরি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। তারা জানান, সিরিঞ্জের ভেতরে আগের রোগীর রক্ত বা ভাইরাস থেকে গেলে তা অন্য দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি ইনজেকশন ব্যবহারের প্রবণতা এবং হাসপাতালগুলোতে সরঞ্জামের ঘাটতিও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

একজন চিকিৎসক প্রথম এই অস্বাভাবিক সংক্রমণ লক্ষ্য করেন, যখন তার কাছে আসা বহু শিশুর এইচআইভি রিপোর্ট পজিটিভ আসে—যাদের বেশিরভাগই ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল। এমনকি একজন অভিভাবক নার্সদের একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে দেখে বাধা দিলেও তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

যদিও হাসপাতালের বর্তমান প্রধান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, অতীতে একই অভিযোগে একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও পরে তাকে আবার অন্যত্র নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এর আগেও পাকিস্তানে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে—২০১৯ সালে সিন্ধুর রাতোদেরো শহরে প্রায় ১,৫০০ শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়। সম্প্রতি করাচির একটি সরকারি হাসপাতালেও বহু শিশুর সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তৌনসার অর্ধেকের বেশি সংক্রমণের পেছনে দূষিত সুঁই দায়ী। এদিকে সামাজিক কুসংস্কার ও ভয়ের কারণে আক্রান্ত শিশুদের সমাজ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। আসমাও সেই বৈষম্যের শিকার—বন্ধুরা আর তার সঙ্গে খেলতে আসে না।

তবুও আসমার স্বপ্ন—সে বড় হয়ে একজন চিকিৎসক হবে, যে কখনোই অবহেলা করে কোনো শিশুর ক্ষতি করবে না। কিন্তু দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেই স্বপ্নকে কঠিন বাস্তবতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন