সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

শিরোনাম

লেবাননে গির্জায় হামলা চালিয়েও ‘খ্রিষ্টানদের রক্ষাকর্তা’ সাজার দাবি নেতানিয়াহুর

সোমবার, জুলাই ৬, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

লেবাননে ইসরাইলি হামলায় বহু গির্জা ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় স্থান ধ্বংস হয়েছে। অথচ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি, উলটো লেবাননের খ্রিষ্টানরাই তাদের গ্রামগুলোকে ইসরাইলের সঙ্গে ‘যুক্ত’ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

রোববার (৫ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসরাইলপন্থি সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’ অনুষ্ঠানে সঞ্চালক জ্যাকি হেনরিখকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা… আমাদের বন্ধুদের যত্ন নিই, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিষ্টানদের।’

নেতানিয়াহু বলেন, ‘লেবাননের কয়েকটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত গ্রাম আসলে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কারণ, আমরা তাদের হিজবুল্লাহর চরমপন্থিদের হাত থেকে রক্ষা করি, যারা তাদের হত্যা করতে চায়। আর মধ্যপ্রাচ্যের সব জায়গাতেই খ্রিষ্টানদের জন্য আমরা একই কাজ করে থাকি।’

তবে লেবাননে ইসরাইলের নিজেদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এই দাবির বিন্দুমাত্র মিল নেই। সেখানে ইসরাইলি বাহিনী গির্জা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থানগুলোর ক্ষতি করেছে এবং ইসরাইলি সেনাদের খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রতীকের অবমাননা করার ভিডিও সামনে এসেছে।

নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছিলেন, ‘পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত।’ অধিকৃত দক্ষিণ লেবাননে চার ইসরাইলি সেনার মৃত্যুর পর তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।

গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘোরা নেতানিয়াহু তার দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। লেবাননের কোনো খ্রিষ্টান গ্রাম ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে বা সুরক্ষা চেয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তিনি দেননি। এমনকি হিজবুল্লাহ খ্রিষ্টান গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়েছে, এমন প্রমাণও তিনি দিতে পারেননি। উলটো লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রধান খ্রিষ্টান মিত্র হলো ‘ফ্রি প্যাট্রিয়টিক মুভমেন্ট’ (এফপিএম)।

ইসরাইলের ‘খ্রিষ্টান সমস্যা’

লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ দেশটির ওপর হামলার কারণে ইসরাইল যখন ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েছে, ঠিক তখনই খ্রিষ্টানদের সুরক্ষা দেওয়ার এই দাবি করলেন নেতানিয়াহু।

গত মে মাসে ফরাসি সংগঠন ‘ল্যুবর দোরিঅঁ’ জানিয়েছিল, ইয়ারুন গ্রামে গ্রিক ক্যাথলিক ধর্মীয় সম্প্রদায় সালভাটোরিয়ান সিস্টারস-এর একটি মঠ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী।

গত এপ্রিলে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায়—দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরাইলি সেনা ড্রিল মেশিন (জ্যাকহ্যামার) দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর একটি মূর্তি ভাঙছেন। পরে ইসরাইলের প্রধান রাব্বিনেট (ইহুদি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ) ওই সেনার মূর্তি ভাঙার ঘটনার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরে ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরাইলি সেনা ভার্জিন মেরির (কুমারী মেরি) মূর্তির অবমাননা করছেন।

গত বছর দক্ষিণ লেবাননের দেরদঘায়া গ্রামে মেলকাইট গ্রিক ক্যাথলিক সেন্ট জর্জ চার্চকে বোমা মেরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় ইসরাইল।

ইসরাইলের এসব হামলা কেবল লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপরই সীমাবদ্ধ নেই। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও গির্জার ওপর সহিংসতাও বেড়েছে।

এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের অন্যতম প্রধান সমর্থক গোষ্ঠী ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের কাছে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে নেতানিয়াহু দাবি করেন, ‘শুধু লেবাননের খ্রিষ্টানরাই আমাদের কাছে সুরক্ষা চায় না। দ্রুজ সম্প্রদায়, সুন্নি মুসলিম এবং বেশ কিছু শিয়া মুসলিমও আমাদের কাছে সুরক্ষা চায়।’

তবে এই গোষ্ঠীগুলোর কেউ ইসরাইলের কাছে আদৌ সুরক্ষা চেয়েছে কিনা, তার কোনো প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরাইলি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪ হাজার ৩০৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ২০৩ জন আহত হয়েছেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন