ইফতেখার ইসলাম: লোকমুখে বেশ প্রচলিত একটি কথা রয়েছে- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে তাদের ইচ্ছে জানতে চাওয়া হলে তারা সকল সুযোগ সুবিধাকে পাশে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল গরু চরানোর স্বাধীনতা চেয়েছিলো। প্রচলিত এই কথার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কার্যকালাপ ইঙ্গিত করে তারা মোটেও খুশি নন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। তার প্রমাণ মেলে শিক্ষার্থীদের উপর স্থানীয়সহ বিভিন্ন মহলের আক্রোশের ঘটনাগুলোয়।
শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে দেশের একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারণে জোবরা অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান পাল্টেছে। তবে তাদের মনোভব হয়তো পাল্টে নি! তাইতো সুযোগ পেলেই গিলে খেতে চান দেশের নানান প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার জ্ঞান পিপাসুদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে একে একে ছিনতাই, খাবারের দোকানদারদের আক্রোশ, রিক্সা ও সিএনজি চালক কর্তৃক প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের উপর হামলা, কটেজ মালিকদের আধিপত্য, সুযোগ পেলেই ৩ নম্বর তরী বাস সার্ভিসের চালকদের বাড়তি ভাড়া ও শিক্ষার্থী হেনস্থা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি প্রকৃতিতে আগুন ও গাছ কাটার ঘটনা তো আছেই। এ সমস্ত ঘটনায় এক প্রকার লোক দেখানো বা মুখ বন্ধের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আবার কিছু কিছু পদক্ষেপ ছিলো শিক্ষার্থীদের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। তাই এসব বিষয় নিয়ে ক্ষোভে পুষছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রশ্ন তুলছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের দক্ষতা নিয়েও!
সম্প্রতি দুই ঘটনায় ১৫ শিক্ষার্থী আহত:
ইফতারের আগে ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে নাজিরহাটগামী বিকেল সাড়ে ৪ টার শাটলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন অনেক শিক্ষার্থী। কারণ এই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পর্যাপ্ত কোন বাস সেবা থাকে না। এর জন্য শিক্ষার্থীদের রেল ক্রসিং এলাকায় নামতে হয়। এক সাথে অনেক শিক্ষার্থী আসলে রিক্সা বা সিএনজি পেতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় শিক্ষার্থীদের। এর ফায়দা নিয়ে সিএনজি চালকদের মাঝে চলে ভাড়া বাড়তির প্রতিযোগিতা। আর এই বাড়তি ভাড়া নিয়ে গত এক সপ্তাহে ঘটেছে পৃথক বেশ কয়েকটি ঘটনা। যারমধ্যে দুই ঘটনায় শিক্ষার্থীদের উপর মারধর করে সিএনজি চালকরা। এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সাথে সিএনজি চালকের বাকবিতন্ডাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের তোপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ শিক্ষার্থী আহত হন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলে স্থানীয় প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কিছু পরামর্শ বেরিয়ে আসলেও বিষয়টি অমিমাংসিত রয়ে যায়। এর আগে, গত ১১ এপ্রিল সিএনজি চালকের হাতে মারধরের শিকার হোন আরো তিন শিক্ষার্থী।
শাটলে পথর নিক্ষেপ:
সিএনজি চালকদের আগ্রাসনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শঙ্কার বিষয় হয়ে উঠে শাটল ট্রেন। তার পেছনে ছিলো শাটলে লাগাতার পাথর নিক্ষেপ। সপ্তাহের ব্যবধানে শাটলে পাথর নিক্ষেপে অন্তত ৯ শিক্ষার্থী আহত হোন। আর সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবারও শাটলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। যদিও গত ৯ এপ্রিল পাথর নিক্ষেপের দায়ে তিনজনে আটক করে পুলিশের কাছে হাওলা করে শিক্ষার্থীরা।
তরী বাস সার্ভিসের নাটকীয়তার শেষ কোথায়:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেইট থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত রয়েছে তরী বাস সার্ভিস৷ তবে এই বাস সার্ভিসে চালকরা প্রতিনিয়ত থাকেন সুযোগের অপেক্ষায়। সুযোগ পেলেই লোকাল বাস হয়ে যায় রিজার্ভ। আর সন্ধ্যা গড়াতে বন্ধ হয়ে যায় এই বাস সার্ভিসগুলোর সেবা। কিছু বাস অক্সিজেন আবার কিছু বাস ফতেবাদ এসেই থামিয়ে দেয় চাকা। এতে করে শিক্ষার্থীদের বেছে নিতে হয় হাটহাজারী থেকে মুরাদপুরের স্পেশাল সার্ভিস। যেখানে বাড়তি ভাড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় আর্থিক সমস্যায়। এছাড়া এই তরী বাস সার্ভিসের চালকরা সুযোগ পেলেই ছাত্রীদের উপর হামলে পড়ার অভিযোগ আছে। বিগত বছরগুলোতে এমন ভয়ানক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশকেও ছাড় দিচ্ছে না:
শুধু শিক্ষার্থী নয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপরও রয়েছে একটি মহলের বদনজর। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ে প্রতিনিয়ত চলে আগুন লাগানোর ঘটনা। বিগত ৩ তিন বছরে প্রায় ৪০ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে চবিতে। সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাহাড়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। তবে এইসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ছিলো না কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। কেবল আগুন নিভিয়েই ক্ষান্ত হোন কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ আছে, এসব আগুন লাগার পেছনে স্থানীয় একটি মহলের হাত রয়েছে। যারা আগুন লাগিয়ে পাহাড়ের লতা-গুল্ম পুড়িয়ে চাষাবাদের ব্যবস্থা করেন। আবার কেউ কেউ আগুন লাগিয়ে বড় গাছ কাটার ফাঁদও পেলেন বলে অভিযোগ আছে।
নিষেধাজ্ঞাই পরিস্থিতি সামালের হাতিয়ার:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যের জন্য দেশব্যাপী সমাদৃত। এই ক্যাম্পাসের বাঁকে বাঁকে আছে দর্শনীয় স্থান। তবে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞায় এইসব স্থান ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। আর এর পেছনে রয়েছে দূর্ভিত্তদের হামলা ও ছিনতাই। করোনার বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের না যাওয়া কারণে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে ছিনতাইয়ের ঘটনা কম থাকলেও ২০১৯ সাল ও ২০২০ সালে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের চালন্দা,টেলিহিল,পাম বাগানসহ বেশকিছু স্থানে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন। পরে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি- চালন্দা গিরিপথ, ঝর্নার পাড়, টেলিটক পাহাড়, শহীদ আব্দুর রব হলের পেছনের পাহাড়, বিজ্ঞান অনুষদ ও জীববিজ্ঞান অনুষদের পেছনের পাহাড়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ/ভ্রমণ না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ সংক্রান্ত এক নির্দেশনা দেয় কর্তৃপক্ষ।
এসব ঘটনা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের দোকানগুলোতে দোকান মালিক ও কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার; বাড়তি দাম ও খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ, কটেজ মালিকদের কর্তৃক হেনস্থার ঘটনা তো আছেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, দিনে দিনে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হাত তুলতে দ্বিধা বোধ করছেন না সিএনজি চালকরাও। আর এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ও সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া।
শিক্ষার্থীরা বলেন, একে একে সব ঘটনায় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নিলেও বৃহৎ পরিসরে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিভিন্ন ঘটনা ঘটার কয়েকদিন পর্যন্ত মাঠ গরম থাকলেও পরে সেসব সমস্যা সমাধান না হয়েই দমাচাপা পড়ে যায়। আর এতে করে বাড়ছে অপরাধের মাত্রা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব ঘটনা হেলায় পেলে না দিয়ে তদন্তের মাধ্যম সঠিক রহস্য উন্মোচন করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে প্রতি দিন নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবে। আর শিক্ষার্থীদের উপর হাত তোলাও হয়ে যাবে সাধারণ ঘটনা।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ:
জানতে চাইলে চবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, সিএনজি চালকদের কর্তৃক মারধরের ঘটনায় আমরা সকলের সাথে বসেছি। এ ঘটনায় আমরা সিএজির মালিক, স্থানীয় ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে বসে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
চবি প্রক্টর বলেন, আমরা কোন ঘটনা ঘটলে তার তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করি। তবে তখন সমস্যা সেই জায়গা থেকে সৃষ্টি না হয়ে অন্যভাবে হয়। সম্প্রতি সৃষ্টি হওয়া এই সমস্যায় তৃতীয় কোন পক্ষের ইন্দন আছে কি না আমরা সেটিও যাচাই-বাছাই করছি।
তরী বাস সার্ভিসের প্রসঙ্গ তুলে ধরলে চবি প্রক্টর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে হওয়া বিষয়টি আমাদের আওতার বাইরে। তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত নিজস্ব বাস দেওয়া আলোচনা করছি; যা শেষ পর্যায়ে। আশা করছি বাস দেওয়া হলে এ সমস্যা নিরসন হবে।
এইদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ঘটনা রোধে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি দরকার মানসিক পরিবর্তন। কেউ কেউ ভুল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে বড়াই করে আবার কেউ স্থানীয় হিসেবে প্রভাব খাটাতে চায়। আর স্নায়ু যুদ্ধের দাপট দেখাতে গিয়ে অনেক ছোট ঘটনা বড় হয়ে যায়। আর এসব রোধে প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং, মানসিক চিন্তা ধারার পরিবর্তনের উপরও জোর দেওয়ার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন