সামরিক শক্তিধর একটি পক্ষ যখন শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানো নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তখন বিষয়টি নিঃসন্দেহে গভীর অস্বস্তির জন্ম দেয়। গাজায় যেখানে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি শৈশবের স্বাভাবিক অনেক অর্থই কেড়ে নিয়েছে, সেখানে একটি সাধারণ ঘুড়িও এখন যুদ্ধের ভাষায় ঢুকে পড়েছে।
২০২৬ সালের আগস্টে গাজা থেকে কয়েকটি ঘুড়ি সীমান্তবর্তী ইসরাইলি জনপদের দিকে উড়ে যায়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পরে জানায়, উদ্ধার করা ঘুড়িগুলোতে সন্দেহজনক কোনো বস্তু ছিল না এবং সেগুলো কোনো ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করেনি। তারপরও ঘুড়ির উপস্থিতিকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখানো হয়।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ঘোষণা দেন, বিস্ফোরক থাকুক বা না থাকুক, বেলুনকে ঘুড়ি এবং ঘুড়িকে ড্রোন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও কাটজ সতর্ক করে বলেন, ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এমনকি যেসব এলাকাকে ঘুড়ি উৎক্ষেপণের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, সেখানকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
এরপর ২৫ আগস্ট গাজার বিভিন্ন কমিটি অভিভাবকদের সন্তানদের ঘুড়ি ওড়াতে নিষেধ করার আহ্বান জানায়। ঘুড়ি বিপজ্জনক হয়ে গেছে বলে নয়, বরং ঘুড়ির সুতো ধরে থাকা শিশুটিই এখন লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এই আশঙ্কায়।
রয়টার্সকে গাজার এক মা জানান, তার ১০ বছর বয়সি ছেলে প্রতি গ্রীষ্মেই ঘুড়ি ওড়াত। কিন্তু এখন তিনি আর তাকে ঘুড়ি ওড়াতে দেবেন না।
ইতিহাস
অবশ্যই এর পেছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। ২০১৮ সালে গাজায় শুরু হওয়া ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ আন্দোলনের সময় ফিলিস্তিনিরা আগুন লাগানো ঘুড়ি ও বেলুন ব্যবহার করেছিলেন। এসবের কারণে ইসরাইলের কৃষিজমিতে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে।
ফিলিস্তিনি কিছু অধিকারকর্মী এসবকে প্রচলিত শক্তির বাইরে এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে ইসরাইল এগুলোকে সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে সেই ইতিহাস বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব কমায় না; বরং পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট করে। এবার যে ঘুড়িগুলো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে আগুন লাগানোর কোনো উপাদান ছিল না বলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীই জানিয়েছে।
তারপরও একটি শিশুর সাধারণ ঘুড়িকে সশস্ত্র ড্রোনের সমতুল্য বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে নিরাপত্তা হুমকির সংজ্ঞা কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। গাজায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এই নিরাপত্তা-নির্ভর নিয়ন্ত্রণের প্রভাব দেখা যায়। এমনকি কোনো নারী সন্তান প্রসবের সময় চেকপয়েন্টে থাকলেও সন্দেহ ও নিয়ন্ত্রণের একই কাঠামোর মুখোমুখি হতে হয়।
প্রতিরোধের কোনো ঘটনার পর একটি আবাসিক এলাকাও রাতারাতি সামরিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের কোনো শিবিরের আকাশেও একটি শিশুর ঘুড়ি সেই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে।
সাধারণ জীবনযাপনের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত
অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিসর সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, সম্পত্তি ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরও বাড়িঘরে হামলা, কৃষিজমিতে বিধিনিষেধ, গবাদিপশু ও জলপাইগাছের ক্ষয়ক্ষতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অব্যাহত উপস্থিতিকে অবৈধ বলে মত দেয়। আদালত ইসরাইলের বসতি স্থাপন নীতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবেও চিহ্নিত করে। এরপরও ভূখণ্ড দখল ও সম্প্রসারণের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি গবেষকদের কাজও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ালিদ খালিদির নথিবদ্ধ করা জনশূন্য হয়ে পড়া গ্রাম, নুর মাসালহার জনসংখ্যা স্থানান্তরের ইতিহাস, এডওয়ার্ড সাঈদের ফিলিস্তিনি দৃষ্টিভঙ্গি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা এবং রশিদ খালিদির শতাব্দীব্যাপী ঔপনিবেশিক সংঘাতের বিশ্লেষণ—সবই বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝার আলাদা বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তুচ্যুতি শুধু অতীতের কোনো ঘটনা নয়; বরং ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতি নিয়ে চলমান সংঘাতের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
ইসরাইলি সামরিক তৎপরতার প্রভাব গাজা ও পশ্চিম তীরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সীমান্ত থাকলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষ ইসরাইলি সামরিক শক্তির প্রভাব থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকছে না।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার ভাষা সামনে আসে। কিন্তু বোমা হামলা, বাস্তুচ্যুতি, দখল বা ভূখণ্ড সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকা মানুষের কাছে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটির অর্থ সামরিক শক্তির অন্য পাশে থাকা মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
কেন একটি ঘুড়ি এত গুরুত্বপূর্ণ?
সম্ভবত এখানেই ঘুড়ির প্রতীকী গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে তৈরি একটি ঘুড়ি প্রায় কিছুই বহন করে না। এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। এর উদ্দেশ্য দখল করা নয়, আকাশে ভেসে ওঠা। ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে ঘেরা কোনো শিশুর কাছে ঘুড়ি ওড়ানো হয়তো চলাফেরার স্বাধীনতার অবশিষ্ট কয়েকটি উপায়ের একটি। শিশুটির শরীর হয়তো সীমাবদ্ধ, কিন্তু তার ঘুড়ির আকাশ সীমাবদ্ধ নয়।
আর সম্ভবত এ কারণেই ঘুড়িকে ঘিরে প্রতিক্রিয়াটি এত বেশি মনোযোগ দাবি করে। কোনো দখলদার সামরিক শক্তি হুমকির সংজ্ঞা ক্রমাগত বিস্তৃত করছে—এই কারণে শিশুদের শৈশব বিসর্জন দিতে বলা যায় না।
গাজা থেকে আসা সবচেয়ে অস্বস্তিকর দৃশ্য হয়তো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ট্যাংক নয়। সেটি হতে পারে এক মায়ের মুখে উচ্চারিত একটি সাধারণ বাক্য— ‘ঘুড়ি ওড়াবে না। তারা দেখে ফেলতে পারে।’
এই বাক্যটি বিশ্ববিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। কারণ যখন একটি শিশুর ঘুড়িও আকাশে ওড়ানোর জন্য ‘অতিরিক্ত বিপজ্জনক’ হয়ে ওঠে, তখন কেড়ে নেওয়া হয় শুধু একটি খেলনা নয়; কেড়ে নেওয়া হয় সেই সামান্য পরিসরটুকুও, যেখানে একজন ফিলিস্তিনি শিশু নিছক একজন শিশু হয়ে থাকতে পারে।


চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন