বিমান ও নৌবাহিনী দিয়ে ইরানকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এবার স্থলবাহিনী মোতায়েন করবেন। এমনটাই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ‘এসক্যালেশন ট্র্যাপ’ সাবস্ট্যাকের লেখক রবার্ট পেপ।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রবার্ট পেপ বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো আগামী কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও স্থল অভিযান শুরু করবেন না। তবে তিনি এরই মধ্যে বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা দেখে ফেলেছেন এবং প্রতিদিন তাকে এ বিষয়ে জানানোও হচ্ছে।
নৌবাহিনীর সীমাবদ্ধতাও তার চোখে পড়েছে। সুতরাং, তার হাতে এখন কেবল একটি বাহিনীই বাকি আছে, আর তা হলো স্থলবাহিনী।
এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযানও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে পারে। তবে ট্রাম্পের হাতে এখন সংঘাত আরও বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প অবশিষ্ট নেই।
এই পরিস্থিতিকে ‘সংঘাত বিস্তারের ফাঁদ’ (এসক্যালেশন ট্র্যাপ) হিসেবে আখ্যায়িত করে পেপ বলেন, এটাই হলো সেই ফাঁদ—হয় তাকে ওই পথে (স্থল অভিযান) হাঁটতে হবে, নাহলে হার মানতে হবে। আর ট্রাম্প হার মানলে ইরান বিশ্বশক্তির চতুর্থ কেন্দ্রে পরিণত হবে। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য হবে এক চরম পরাজয়। এর ফলে ইতিহাসে তার ভাবমূর্তি পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া এই সশস্ত্র সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। অপারেশন এপিক ফিউরি (Operation Epic Fury) নামে যুক্তরাষ্ট্রের এবং রোয়ারিং লায়ন (Roaring Lion) নামে ইসরাইলের এই যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে।
প্রথম দফার এই হামলায় ইরানের প্রায় চার দশকের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা নিহত হন। তবে এই হামলার সময় বন্দর আব্বাসের কাছে একটি নৌঘাঁটির পাশে অবস্থিত বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে প্রায় ১৭০ জন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরান সরকার দ্রুত তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপরই ইরান ভয়াবহ পালটা আক্রমণ শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন দূতাবাস, সামরিক স্থাপনা এবং ইসরাইলের দিকে ৬৫০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করে তেহরান। এই পালটাপালটি হামলায় ইরান, লেবানন, ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সংঘাতের জেরে লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে কড়া নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন।
টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল এবং জুনে একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনাও শুরু হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল নিয়ে চরম মতবিরোধের জেরে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। বর্তমানে নতুন করে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। বিমান ও নৌবাহিনী দিয়ে ইরানকে পুরোপুরি পরাস্ত করতে না পারায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন স্থলবাহিনী মোতায়েনের মতো চরম বিকল্প নিয়েও চিন্তাভাবনা করছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।






চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন