ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের দ্রুত উত্থানের পেছনে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সরাসরি দিকনির্দেশনা ছিল বলে দাবি করেছে ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্র। সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলতে হুথিদের অগ্রযাত্রায় ইরানের সহায়তা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলের মাধ্যমে হুথিরা কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। এই প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বাব আল-মান্দাবেও নৌ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
এদিকে, দুই ইরানি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহে ইরান হুথিদের যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়াতে বলেছে।
এ কাজে আরও অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।
ইরান হুথিদের মিত্র হিসেবে স্বীকার করলেও প্রকাশ্যে তাদের সামরিকভাবে পরিচালনার কথা অস্বীকার করে। তেহরানের দাবি, হুথিরা ইরানের ‘প্রক্সি’ নয়।
তবে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক আঞ্চলিক কূটনীতিকের দাবি, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইতোমধ্যে ইয়েমেনে গিয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলার কৌশল নির্ধারণ ও পরিচালনায় ভূমিকা রেখেছেন।
ইরানের এক কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, মোখা দখলের সিদ্ধান্ত হুথিদের নিজেদের। তবে এর ফলে তেলের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের জন্য ক্ষতিকর এবং ইরানের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক।
ইরানি কমান্ডারের নামও সামনে
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের পাঁচ সামরিক কর্মকর্তার দাবি, লোহিত সাগরের উপকূলীয় সমতল এলাকা তিহামায় হুথিদের নতুন অভিযান রেভল্যুশনারি গার্ডের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে।
তাদের দাবি, যোগাযোগের তথ্য ও আটক হুথি যোদ্ধাদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে তারা ধারণা করছেন, এই অভিযান পরিচালনায় ইরানের কুদস ফোর্সের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার আব্দোলরেজা শাহলেই যুক্ত থাকতে পারেন।
তবে ইরানের কোনো সূত্র এখনো সরাসরি এ তথ্য নিশ্চিত করেনি। এর আগে ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছিল, শাহলেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনে সময় কাটিয়েছেন।
ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান ও সমুদ্র অবরোধ থাকা সত্ত্বেও ইরান এখনো সেখানে অস্ত্র ও জনবল পাঠাতে সক্ষম হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, মোখা দখলের অভিযান গত এক সপ্তাহ বা এক মাসে হঠাৎ করে প্রস্তুত করা হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফল।
তার মতে, ইরান সরাসরি কিংবা বিভিন্ন চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হুথিদের যে নতুন অস্ত্র সরবরাহ করেছে, বিশেষ করে ড্রোন, তা তাদের সাম্প্রতিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
হুথিরা মোখার দিকে অগ্রসর হওয়ার পর ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবের কাছে আরও বিমান সহায়তা চেয়েছিল বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনের দুই কর্মকর্তা।
তারা হুথিদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি, রাজধানী সানা এবং তেল সংরক্ষণাগারের মতো কৌশলগত স্থাপনায় সৌদি বিমান হামলা চেয়েছিল।
তবে সৌদি আরব এখন পর্যন্ত মূলত অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জাওফ ও মারিব প্রদেশে সীমিত বিমান হামলাও চালিয়েছে তারা।
ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের ধারণা, হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালালে সৌদি ভূখণ্ডে আরও ভয়াবহ ড্রোন হামলা হতে পারে—এ আশঙ্কায় রিয়াদ বড় সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই থেমে ছিল। ফলে বর্তমানে দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতা ও অবস্থান পুরোপুরি নির্ণয় করা কঠিন।
ইরান ও সৌদি আরব—উভয় দেশই ইয়েমেনে নিজেদের সমর্থিত বাহিনীর পেছনে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জোটের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, সৌদি আরব প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলে সরকারি বাহিনী কিছু এলাকায় অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। তবে এবার হুথিদের উপকূলীয় অবস্থান থেকে সরানো আগের চেয়ে কঠিন হতে পারে।


চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন