ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: রোববার ১ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস-২০২১। ১৯৯০ সালের ইতালির ফ্লোরেন্সে ইনোসেনটি গবেষণা কেন্দ্রের ঘোষণার সম্মানে ১৯৯২ সাল থেকে বিশ্ব স্তন্যপান সপ্তাহ (ডব্লিউবিডব্লিউ) সারা বিশ্বে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উৎসাহিত করতে একটি বৈশ্বিক প্রচারাভিযান। মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহর প্রথম দিন ১ আগস্টকে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে। ঘোষণা পত্রে সই করে বিভিন্ন দেশের সরকার, ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচওসহ অন্যান্য সংস্থা, ১৯৯১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সেই ঘোষণাপত্র সমর্থন করে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন (ডব্লিউএবিএ) নামের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। জাতিসংঘের দুই সংস্থাসহ সরকারি উদ্যোগে ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বের ১৭০টি দেশে পালিত হয় সপ্তাহটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাতৃদুগ্ধ পানে শিশু যেমন সুস্থ ও সবল হয়ে বেড়ে ওঠে, তেমনি উপকৃত হন প্রসূতি নিজেও। শুধুই মাতৃদুগ্ধ পান করালে বছরে আট লাখের বেশি শিশুর জীবন রক্ষা পাবে। যে শিশুদের বেশির ভাগেরই বয়স ছয় মাসের কম। মাতৃদুগ্ধ পান করালে মায়েদের স্তনে ক্যানসার, ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জাতীয় পুষ্টিসেবা, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সহযোগীতায় বাংলাদেশে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ সফলভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। এ বছরের বিশ্ব স্তনদানের সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হল ‘বুকের দুধ খাওয়ানো রক্ষা করুন, একটি ভাগ করা দায়িত্ব’ ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন (ওয়াবা)।
আমাদের দেশে এখন হাজার হাজার মা নিজের বুকে দুধ পান করার পরিবর্তে বাজারে কৃত্রিম দুধ পান করান নিজের সৌন্দর্যকে ধরে রাখার জন্য। এতে লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। ভবিষ্যত জীবন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে শিশুর। মায়ের দুধ হচ্ছে শিশুর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট খাবার এবং পানীয়। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ মায়ের দ্রুত আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। আর পৃথিবীতে সম্ভব সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়- মাতৃগর্ভ। এর চেয়ে নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত ও আরামদায়ক স্থান সম্ভব নয়। সেখান থেকে একজন নতজাতক যখন ধুলোবালি মাখা জীবাণু সংকুল পৃথিবীতে আসে, তার নাজুক শরীর ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতার কারণে জীবন হয় ঝুঁকিপূর্ণ! এ পরিবেশে একটি নিরাপত্তাবেষ্টনীর মত তাকে সব প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে মমতাময়ী মায়ের কোল ও শিশুর রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতার অসাধারণ গুনাবলী সমৃদ্ধ মাতৃদুগ্ধ! আমাদের দেশে এ ব্যাপারটি অত্যন্ত অবহেলিত- কারণ ধরেই নেয়া হয় যিনি জন্ম দিলেন, তিনি তো স্তন্যদান করবেনই, এটা তার একার দায়িত্ব এবং অবধারিত ব্যাপার। বিষয়টি এত সহজ নয়, আর সে কারণেই দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত অনেক সদ্য প্রসূতীর সন্তান মার্তৃদুগ্ধ থেকে বন্চিত হচ্ছে! মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত শিশুরা বিভিন্ন রোগে সহজে আক্রান্ত হয় এবং কখনো অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। মায়ের দুধ শিশুর জন্য শুধুমাত্র শ্রেষ্ঠ পুষ্টিকর ও সঠিক খাদ্য নয় বরং তা যে কোন রোগ প্রতিরোধক টিকার চেয়ে অধিক শক্তিশালী ও কার্যকর। ডায়রিয়া, ইনফ্লুয়েন্জ্ঞা, অটাইটিস মিডিয়া, হারপিস ইনফেকশন, শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন, নেক্রোটাইজিং এন্টারোপ্যাথি ইত্যাদি রোগের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়া ছাড়াও কৃত্রিম টিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। ফর্মূলা বা কৃত্রিম শিশু খাদ্যে লালিত শিশুদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি মার্তৃদুগ্ধে লালিত শিশুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এব রোগ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যহত করে এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক গুণ বৃদ্ধি করে।
মায়ের দুধ যে শুধু মাত্র শ্রেষ্ঠ পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা সম্পন্ন তাই নয় বরং তা শিশুর জীবন রক্ষার সাথে সাথে সাশ্রয়ীও। শিশুখাদ্য হিসেবে মাতৃদুগ্ধ পরিবারের খরচ ও সময় দুইটার সাশ্রয় করে থাকে। ব্রেস্টফিডিং বা স্তন্যদানে সবচেয়ে প্রথম এবং প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মায়ের সুস্বাস্থ্য (শারিরিক ও মানসিক দুটোই)। গর্ভবতী মায়ের দেহে বিভিন্ন হরমোনের আধিক্য দেখা যায়। বলা যায় গর্ভবতীর শরীরে চলে হরমোনের উৎসব। যার ফলে তিনি শারিরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ প্রভাবিত হন। শিশুর জন্মের পর এ প্রভাব কিছুটা কমে এলেও তিনি শারিরিকভাবে দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। শিশুর লালন পালনে আর সব কিছুর মত মাতৃদুগ্ধ দানে মায়ের পাশাপাশি পিতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপারটি অনেককে অবাক করলেও এটাই বাস্তবতা। শিশুকে স্তন্যদান করবেন মা আর সেই মায়ের যত্ন, তার পুষ্টি, বিশ্রাম নিশ্চিত করবেন পিতা; এ সময় মায়ের যথাযথ খাদ্য গ্রহণ ও পুষ্টি জরুরী। মায়ের পুষ্টিহীনতা মতৃদুগ্ধ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ সময় সাধ্য অনুযায়ী দুধ, ডিম, সব্জিসহ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরী; স্তন্যদানকারী মায়েদের হাইড্রেশন বা পর্যাপ্ত পানি পান অত্যন্ত জরুরী; মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম (প্রতিদিন নুন্যতম আট ঘন্টা) জরুরী।
বিশেষ খাবার: বিভিন্ন দেশের নিজ নিজ বিশ্বাস ও ঐতিহ্যনুসারে এ সময় শিশু খাদ্যের পরিমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে মায়েদের ভিন্ন ভিন্ন ফল, সব্জি, ভেষজ ও খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত করে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হল-দুধ, কালোজিরা, লাউ, সাগুদানার পায়েস, পেঁপে, মেথী। আমাদের দেশে কালোজিরার মত জাপান এবং বর্তমানে আমেরকিায়ও মেথী গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়। ল্যাক্টেশন সেন্টারে ক্যাপসুলাকারে মেথী, মেথীর চা বিপুল পরিমাণে বিক্রী হয়ে থাকে।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য: আন্তরিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজে ফেরার পর অনেক মায়ের সন্তানকে কৃত্রিম খাবার বা বেবিফুড, গরুর দুধ বা পাউডার দুধের আশ্রয় নিতে হয়, যা মোটেও কাম্য নয়। এ সমস্যা সমাধানে কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রায় বন্ধু সম একটি যন্ত্র ‘ব্রেস্ট পাম্প।’ কাজের সময় শিশুকে স্তন্য দান সম্ভব না হলে তারা এ পাম্পের সাহায্যে মতৃদুগ্ধ সংগ্রহ করে, তা যথাযথ উপায়ে সংরক্ষণ করতে পারেন। যা তাদের অনুপস্থিতিতে পরিবারের অন্য কেউ বোতলের মাধ্যমে শিশুকে খাওয়াতে পারেন। ফলে মায়ের অনুপস্থিতিতেও শিশুটি মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হয় না। নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে স্তন্যদানের শুরুতেও ব্রেস্টপাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রেস্ট পাম্প বিভিন্ন দামের আছে। তবে ইলেক্ট্রিক পাম্প সবচেয়ে কার্যকর ও কিছুটা ব্যয়বহুল। ল্যাক্টেশন সেন্টার থেকে এ পাম্প ভাড়া করা যায়।
একজন পুরুষের কাছে স্তন্যদান যতখানি অপরিচিত ব্যাপার, প্রথম বার সন্তান লাভ করা মায়ের কাছেও অনেকটা তেমনি। তই, গর্ভবতী অবস্থা থেকে এ ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি জরুরী। পরিবারের মুরুব্বী এবং স্বামী উৎসাহ দান করে এ প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। সময়ের সাথে সাথে মানুষ যত আধুনিক ও শিক্ষিত হচ্ছে, উন্নত বিশ্বের মায়েরা ফিরে যাচ্ছেন ব্রেস্ট ফিডিং বা স্তন্যদানে। শিক্ষা, মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা এবং শিশুর জন্য এর গুরুত্ব অনুধাবন তাদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করছে। হাজারো ব্যস্ততার মাঝে শিশু সন্তানকে মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করছেন না। স্তন্যদানে অন্যতম সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মা ও শিশুর মানসিক নৈকট্য বা বন্ধন দৃঢ় করায় এর কোন বিকল্প নেই।
লেখক: কো-চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রোগী কল্যাণ সোসাইটি।






চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন