ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে কেন্দ্র করে দুই মিত্র দেশের মধ্যকার ফাটল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলি সরকারের কিছু মন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
তিনি বলেন, ইসরাইল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চরমভাবে বিচ্ছিন্ন এবং দেশটির নেতারা আমেরিকার কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি যদি ইসরাইল সরকারের ক্যাবিনেট সদস্য হতাম, তবে বিশ্বের বুকে অবশিষ্ট থাকা একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে এভাবে আক্রমণ করার কথা ভাবতামও না।’
তিনি বিগত তিন মাসের সামরিক সহায়তার পরিসংখ্যান তুলে ধরে আরও যোগ করেন, ‘গত তিন মাসে ইসরাইলকে রক্ষাকারী প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকার হাতে তৈরি এবং মার্কিন করদাতাদের টাকায় কেনা।’
ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করে বাস্তবমুখী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইসরাইলের সমস্যা ডোনাল্ড ট্রাম্প নন। ইসরাইলের কেউ যদি মনে করেন যে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তবে তাদের ঘুম থেকে উঠে বাস্তব পরিস্থিতিটা বোঝা উচিত।’
ইসরাইলের সামরিক নীতির সমালোচনা করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘নয় বা দশ মিলিয়নের (জনসংখ্যা) একটি দেশ কেবল হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তাদের সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারে না।’
এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও লেবাননে ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবারও (১৮ জুন) লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইসরাইল দাবি করছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইটি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে হিজবুল্লাহও এই চুক্তির শর্তাবলি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই প্রসঙ্গে জেডি ভ্যান্স কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, বৈরুতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক নাগরিক হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরাইলকে অবশ্যই এই শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। মাসব্যাপী চলা এই অভিযানে দুই দেশ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সমন্বয় সাধন করে।
তবে গত ৮ এপ্রিল প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ থামানোর পক্ষে অবস্থান নেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং এটি বিশ্ব অর্থনীতিতেও মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি করছিল।
এদিকে নেতানিয়াহু চলতি সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো সমালোচনা না করলেও, তার মন্ত্রিসভার উগ্রপন্থী সদস্যরা বেশ মুখর। কট্টর জাতীয়তাবাদী দলের নেতা ও দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গাভির চলতি সপ্তাহে ঘোষণা করেছেন যে ইসরাইল ট্রাম্পের এই চুক্তিতে ‘আবদ্ধ’ নয় এবং কোনো আন্তর্জাতিক চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।
তারই প্রেক্ষিতে জেডি ভ্যান্স ইসরাইলের মন্ত্রিসভার নাম না জানা কিছু সদস্যকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে আখ্যা দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলের বন্ধু খুব কম এবং আমেরিকার বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের সাহায্যেই তারা নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। তবে ভ্যান্সের এই বক্তব্যের পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের অসন্তোষও স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকে থাকার পেছনে তার অবদান রয়েছে এবং তিনি ইসরাইলি নেতাকে ‘উন্মাদ’ বলেও অভিহিত করেন। এমনকি আলোচনার টেবিলে তিনি ইসরাইলকে একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন এবং বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলার সমালোচনাও করেছিলেন।
এদিকে, সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বলেন, ‘ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে যতদিন প্রয়োজন,’ ততদিন তাদের সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত অঞ্চলে অবস্থান করবে। তার এই মন্তব্য যুদ্ধ বন্ধ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার চুক্তির শর্তকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
অবশ্য নেতানিয়াহু মার্কিন সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের মার্কিন বন্ধুদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি, যারা আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। আমরা তাদের এই অবদানকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করি।’






চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন