সোমবার, ২৪ আগষ্ট ২০২৬

শিরোনাম

সৌরবিদ্যুতে বদলে গেছে ইরাকের যে গ্রাম, টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের নতুন দৃষ্টান্ত

সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের ছোট কৃষিপ্রধান গ্রাম কুলাকে একসময় দিনের কাজ শেষ হতো জেনারেটর বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। দেশটির হাজারো গ্রামের মতো এই এলাকাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল অনিয়মিত। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পরই বন্ধ হয়ে যেত পানির পাম্প, নষ্ট হয়ে যেত শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং ঘরের পড়ার টেবিল থেকে বই সরিয়ে রাখত শিশুরা।

এখন কুলাক চলে সূর্যের শক্তিতে। সৌর প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা থাকছে এবং গ্রামের বাসিন্দারা ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। এর প্রভাব শুধু ঘরের আলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। পানির পাম্প সচল থাকায় কৃষিকাজ সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে শীতল সংরক্ষণাগার থাকায় কৃষকেরা ফসল কাটার সঙ্গে সঙ্গেই কম দামে বিক্রি না করে ভালো সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারছেন।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জ্বালানি রূপান্তরের যে আলোচনা চলছে, সেখানে এই দিকটি অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। সৌর প্রযুক্তি এখন তুলনামূলক সস্তা এবং তা স্থাপনের পদ্ধতিও বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু প্যানেল বসানোর পর ব্যবস্থা সচল রাখার স্থানীয় সক্ষমতা তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎকে কৃষি, জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ।

ইরাকের গ্রামীণ জ্বালানি সংকট

বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হয়েও ইরাকের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। গ্রীষ্মে দেশটির তাপমাত্রা নিয়মিত ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকাতেও ইরাকের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘস্থায়ী খরা কৃষিজমি শুকিয়ে দিচ্ছে এবং অতিরিক্ত তাপ অনেক অঞ্চলকে বসবাসের জন্য কঠিন করে তুলছে।

ফলে গ্রামীণ পরিবারগুলোকে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—জীবিকা ধরে রাখার মতো জমিতে থেকে যাবে, নাকি সুযোগের সন্ধানে অতিরিক্ত জনবহুল শহরে চলে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে দুর্গম অঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ শুধু জাতীয় গ্রিড পৌঁছানো পর্যন্ত সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হতে পারে।

বিদ্যুতের বাইরে নতুন সম্ভাবনা

কুর্দিস্তান অঞ্চলের পাঁচটি গ্রামের একটি কুলাক, যেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকল্পে শুধু অবকাঠামো তৈরি নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণ এবং কৃষি উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ স্থানীয় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।

এখানে বিদ্যুৎকে কোনো দান হিসেবে না দেখে স্থানীয় সম্পদ হিসেবে ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মাধ্যমে কৃষকেরা ফসল সংরক্ষণ, ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সেচ এবং গ্রামেই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের সুযোগ পাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় দক্ষতা ছাড়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সৌর প্যানেল স্থাপনের পর সেটির ইনভার্টার নষ্ট হলে মেরামতের লোক না থাকলে পুরো প্রকল্পই অচল হয়ে যেতে পারে। তাই শুরু থেকেই স্থানীয় মানুষের সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

তৃণমূল থেকে জ্বালানি রূপান্তর

জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা সাধারণত কপ সম্মেলন, জি-৭ বৈঠক কিংবা উন্নত দেশগুলোর অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের কাছে এই পরিবর্তন পৌঁছাবে স্থানীয় ও বিকেন্দ্রীভূত উদ্যোগের মাধ্যমে।

ইরাকের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে জাতীয় গ্রিড পৌঁছাতে কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হতে পারে। এর বদলে স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এসব এলাকার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

তবে এই মডেল পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সরকারি নীতি সহায়তা এবং বিভিন্ন অংশীদারের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষি গবেষণা ও উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎকে যুক্ত করার কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

কুলাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সৌর প্যানেলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার চারপাশে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা—শীতল সংরক্ষণাগার, সচল পানির পাম্প এবং আগামী মৌসুমের পরিকল্পনা করা একটি আত্মনির্ভরশীল জনগোষ্ঠী।

ইরাকের জ্বালানি রূপান্তর যদি গ্রাম থেকে গ্রামে এভাবেই গড়ে ওঠে, তাহলে তা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিকল্পনার চেয়ে বেশি টেকসই হতে পারে। এজন্য শুধু প্রযুক্তিতে নয়, সেই প্রযুক্তি পরিচালনাকারী মানুষ, কৃষক, ব্যবসা ও স্থানীয় জীবিকার ওপরও বিনিয়োগ করতে হবে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন