গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয় এখন আর আগের মতো সংবাদ শিরোনামে আসে না। আল-শিফা হাসপাতালে ২০২৩ সালের নভেম্বরের মতো সহিংস অভিযান, হাসপাতালের ওয়ার্ডে বোমা হামলা কিংবা হাসপাতাল চত্বরে গুলিতে মানুষ হত্যার খবরও তুলনামূলক কম শোনা যাচ্ছে। চিকিৎসাকেন্দ্রের নিচে গোপন সুড়ঙ্গ থাকার অভিযোগও এখন আলোচনার বাইরে। অথচ এর অর্থ এই নয় যে, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বরং নীরবে আরও গভীর সংকটে পড়ছে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থা।
এই সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট বাস্তুচ্যুতি শিবিরগুলোতে। যুদ্ধের কারণে গৃহহীন ও দরিদ্র মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এসব মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পৌঁছে দিতে পারছে না। একইভাবে অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিদের পক্ষেও সীমিতসংখ্যক সচল চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পয়োনিষ্কাশনের দুরবস্থা, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট এবং অসহনীয় গরম বা ঠান্ডার মধ্যে বসবাস পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
সম্প্রতি গাজা সিটির নাসর এলাকায় হাসান সালামা স্কুলের ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে ওঠা একটি অনানুষ্ঠানিক শিবির পরিদর্শনে দেখা যায়, ওই স্কুলের মাঠ ও অবশিষ্ট ভবনে শত শত গৃহহীন মানুষ তাঁবু টাঙিয়ে বসবাস করছেন। কোনো সংস্থা শিবিরটি পরিচালনা করে না। ফলে চিকিৎসাসহ নিয়মিত কোনো সেবার ব্যবস্থাও নেই।
২০২৪ সালের আগস্টে পাশের নাসর স্কুলের সঙ্গে ওই স্কুলেও বোমা হামলা হয়। এতে অন্তত ৩০ জন নিহত হন।
স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকের কয়েকজন চিকিৎসাকর্মী সেখানে একদিন বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। ওই দিন অন্তত ১৫০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনির সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের পাশাপাশি হেপাটাইটিস ও স্ক্যাবিসের মতো সংক্রমণও পাওয়া যায়। অনেক শিশুর মধ্যে জলবসন্ত, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা গেছে।
বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী অনেকের জন্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো এখন প্রায় অসম্ভব। যাতায়াতের খরচ, দীর্ঘ পথ, বাস্তুচ্যুতির ক্লান্তি এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন।
এমনই এক রোগী ৪৬ বছর বয়সি এক ব্যক্তি। গোলার টুকরার আঘাতে তার পা গুরুতরভাবে আহত এবং হাঁটার জন্য ক্রাচের প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। কাছের আল-রান্তিসি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু থাকলেও সেখানে মূলত শিশু ও ক্যানসার রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্য হাসপাতালে যেতে হলে শুধু যাতায়াতেই অন্তত ৮ ডলার খরচ করতে হত।
বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের জন্য এই অর্থও অনেক বেশি। অনেকে যেখানে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা তাদের কাছে প্রায় অসম্ভব। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া, ওষুধের সংকট ও কঠিন জীবনযাপনের কারণে রোগ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
গাজায় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে এই পরিস্থিতি অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ সেবা ফিরিয়ে আনা জরুরি। যুদ্ধের আগে গাজাজুড়ে ইউএনআরডব্লিউএর ২২টি ক্লিনিক ছিল। বর্তমানে মাত্র ছয়টি সচল রয়েছে।
গাজার ৩৪টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টি আংশিকভাবে কার্যকর। ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এসব হাসপাতালের অধিকাংশ ওয়ার্ডই আর চালু নেই। বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য পুরো গাজায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার শয্যা রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০টি। যুদ্ধের আগে শুধু আল-শিফা হাসপাতালেই ছিল ৭০০ শয্যা।
পরীক্ষাগার, অস্ত্রোপচার ও বিভিন্ন চিকিৎসাসেবার অনেক কিছুই এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবের পাশাপাশি চিকিৎসাকর্মীর সংকটও রয়েছে।
চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার কার্যত বিশেষ সুবিধায় পরিণত হয়েছে। তাই শুধু হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ নয়, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা এবং বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সরাসরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের স্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রয়োজন।


চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন