মঙ্গলবার, ১৮ আগষ্ট ২০২৬

শিরোনাম

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতায় ফাটল

মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা আস্থা হারাচ্ছেন। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের সরকার ওয়াশিংটনের ওপর ক্রমেই বিরক্ত হচ্ছে। তাদের উদ্বেগ হলো, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামানো মতো কার্যকর কূটনীতি পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছেন।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে একাধিকবার কঠোর সামরিক হুমকি দিয়েছেন। পরে আবার আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলে সেই হুমকি থেকে সরে এসেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো এই নীতিতে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

এই অবস্থায় সবচেয়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে চিন্তা করছে কিছু উপসাগরীয় দেশের নেতারা। তারা আলোচনায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্পকে নিয়ে অসন্তোষ নয়, দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও ভাবনায় পড়েছেন তারা।

এই অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চাচ্ছে না। কারণ ইরানের হামলা ও ক্রমবর্ধমান যুদ্ধে দেখা গেছে- মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকলেও আর এই অঞ্চল পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বৈচিত্রময় অংশীদারত্বের কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

‘ট্রাম্প যুদ্ধ করছেন, আমরা মূল দিচ্ছি’

জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, তিনজন কর্মকর্তা ও একজন প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখন উপসাগরীয় মিত্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা বলছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ বেড়েছে উপসারগীয় দেশের নেতাদের। ওই কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং আমরা তার মূল্য দিচ্ছি।’

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার এবং অস্ত্র সরবরাহকারী হলেও পরিস্থিতি এখান ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও একটি সংকেত

জেরুজালেম পোস্ট জানায়, একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা এই অঞ্চলের কিছু রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে বলে প্রমাণ করে।

এক সাক্ষাৎকারে ওই কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, উপসাগরীয় নেতারা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট মনে করছে না।

আরেক পশ্চিমা কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোভাবের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ভালো চোখে দেখেনি তারা। বিষয়টি ছিল অনেকটা ‘প্রয়োজনীয় মন্দ’ বিষয়। আর এখন এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের কয়েকমাসব্যাপী হামলার পর আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রবেশ করে।

এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিনটি দেশই তাদের কোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করবে। যা ন্যাটোর ৫নং অনুচ্ছেদের অনুরূপ। এই অনুচ্ছেদে ন্যাটো জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার দাবি তোলা হয়েছে।

যদিও রোববার সামাজিকমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রশংসা করেছেন। তিনি এটিকে একটি ‘বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য কীভাবে একত্রিত হচ্ছে এবং দেশগুলো অবশেষে আরও অর্থবহ উপায়ে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজার অস্থির

সোমবার দিনের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ শেয়ার বাজার নিষ্প্রভ ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যান চলাচল কমে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর আগে শনিবার ইরান ওয়াশিংটনকে পরাজয় মেনে নিতে আহ্বান জানানোর পর উত্তেজনা চরমে ছিল।

একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে ‘অত্যন্ত শয়তান’ বলে অভিহিত করেন এবং মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির ক্রমাগত দাম বাড়ার অভিঘাত মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানান।

সৌদি আরবের বেঞ্চমার্ক স্টক সূচক ০.২ শতাংম কমেছে। এর প্রধান কারণ ছিল আল রাজহি ব্যাংক ও তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর ০.৫ শতাংশ দরপতন।

কাতারে বেঞ্চমার্ক স্টক সূচক এক শতাংশ কমে গেছে এবং এর প্রায় সব উপাদানই নেতিবাচক অবস্থানে লেনদেন হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম ঋণদাতা কাতার ন্যাশনাল ব্যাংকের সূচকও ১.৮ শতাংশ কমেছে।

গত সপ্তাহের ট্যাঙ্কার হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

দুবাইয়ের প্রধান শেয়ার সূচক ০.১ শতাংশ কমেছে, যেখানে শীর্ষ ঋণদাতা এমিরেটস এনবিডি ১.৩ শতাংশ লোকসান করেছে। আবুধাবিতে সম্পদ তহবিল ল’ইমাডকে ব্যক্তিগত খাতে দিয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

ওমানের সঙ্গে চুক্তিতে ধাক্কা খাবে ওয়াশিংটন

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের পরিকল্পনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার কাছাকাছি রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটি সোমবার বলেছে, দুই দেশের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের একটি পরিকল্পনা নিয়ে তারা ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে।

উভয় পক্ষ এখন একটি যৌথ বিবৃতির জন্য বিস্তারিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে কাজ করছে বলে বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ঘটনাও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা নতুন কৌশলগত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পরিবহণ পথের মানচিত্র নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি বোঝাপড়া হয়েছে।’

এপি জানায়, এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি প্রশ্ন উঠে। এত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথের স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের বদলে তেহরান-মাস্কাট সমঝোতা কার্যকর হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির দাবি তোয়াক্কা না করেই ইরান–ওমান আলাদা ব্যবস্থাপনা নিয়ে এগোচ্ছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন