রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি বিলাসবহুল বাসভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত দূরপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। পুতিনের গোপন ও অত্যন্ত সুরক্ষাবেষ্টিত এই প্যালেসকে আকাশপথের হামলা থেকে রক্ষা করতেই মূলত এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি স্থাপন করা হয়েছিল। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।
ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর প্রধান মেজর রবার্ট ব্রোভদি জানান, দক্ষিণ রাশিয়ার জেলেন্দঝিক শহরের কাছে অবস্থিত এই এস-৪০০ ‘ট্রায়াম্ফ’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটি ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতের পর প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দাউদাউ করে জ্বলেছে। পুতিনের ইতালীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই বিশাল প্যালেস কমপ্লেক্স থেকে এটি মাত্র ১২ মাইল দূরে অবস্থিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৭ বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত একটি ‘বাফার জোন’ এবং স্থায়ী ‘নো-ফ্লাই জোন’ দিয়ে ঘিরে রাখা এই প্রাসাদকে রক্ষা করতে এস-৪০০ সিস্টেমটির পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং মোবাইল ফায়ার গ্রুপ সমন্বিতভাবে কাজ করছিল।
মেজর ব্রোভদি আরও দাবি করেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটিকে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলায় ব্যবহারের জন্য নতুনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। এমনকি গত ৮ আগস্ট এটি থেকে ইউক্রেনের লোকালয়ে অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজস্ব ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে আসায় রাশিয়া তাদের এস-৪০০ এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইলগুলোকে ভু-পৃষ্ঠে আঘাত হানার উপযোগী হিসেবে ব্যবহার করছে। মিসাইল বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হফম্যান বলেন, ‘এগুলো তুলনামূলক কম নির্ভুল হলেও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক হুমকি তৈরি করে।’
রাশিয়ার প্রয়াত বিরোধী দলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির নেতৃত্বাধীন ‘অ্যান্টি-করাপশন ফাউন্ডেশন’-এর ২০২১ সালের এক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলেন্দঝিকের এই বাসভবনটি তৈরিতে পুতিনের প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড (১০০ কোটি পাউন্ড) খরচ হয়েছে।
বিলাসবহুল এই প্যালেসে ক্যাসিনো, আঙুর বাগান, স্পা, ইনডোর আইস রিংক, থিয়েটার, ডান্স রুম, হুঁকা লাউঞ্জ এবং ‘অ্যাকোয়াটিক ডিসকো’ রয়েছে। ২০২৩ সালে এতে একটি গির্জাও যুক্ত করা হয়।
তবে ইউক্রেনীয় ড্রোনের আক্রমণাত্মক হামলার ভয়ে পুতিন এখন এই কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী প্যালেসে খুব কমই যাতায়াত করেন। এর বদলে তিনি মস্কোর ১৮৫ মাইল পূর্বে লেক ভালদাইয়ের অতি-সুরক্ষিত লাক্সারি ডাচায় বেশি সময় কাটাচ্ছেন। অলিম্পিক জিমন্যাস্ট আলিনা কাবায়েভা এবং তাদের দুই সন্তান এই বাসভবনে থাকেন বলে ধারণা করা হয়। এই বাড়িটি প্যান্টসির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তত ২৭টি টাওয়ার দিয়ে সুরক্ষিত, যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড।
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে আরও দুটি এস-৪০০ লঞ্চার এবং মাঝারি উচ্চতার ওরিওন ড্রোন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি অ্যান্টেনা ধ্বংস হয়েছে। এই হামলায় রাশিয়ার কয়েক কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের এই বৃহৎ আকারের ড্রোন হামলাগুলো প্রায় রাতের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় ৪৫০টিরও বেশি দীর্ঘপাল্লার ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার তাতারস্তানের একটি তেল শোধনাগারে আঘাত হানে। হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়, যা রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে চলমান যুদ্ধের অন্যতম মারাত্মক আঘাত। এ ছাড়া সাইবেরিয়ার তিউমেন অঞ্চলেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে।
ইউক্রেন আশা করছে, এসব হামলার মাধ্যমে ক্রেমলিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদেরকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হবে। তবে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন— মূল সমস্যার সমাধান না করে যুদ্ধবিরতি বা ফ্রন্টলাইন সাময়িকভাবে স্থগিত করার কোনো সুযোগ নেই।






চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন