শুক্রবার, ১৪ আগষ্ট ২০২৬

শিরোনাম

কাস্পিয়ান জুয়া : বদলে দিতে পারে অনেক সমীকরণ

শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। এতদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র বা সংঘাতের অক্ষ আলাদাভাবে আলোচিত হয়ে আসছিল, একটি পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, অন্যটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল-ইরান তীব্র মুখোমুখি অবস্থান।

কিন্তু কাস্পিয়ান সাগরের বুকে রাশিয়া থেকে লোহা বহনকারী একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ ছিল না; এটি ছিল বিশ্বরাজনীতির নতুন দাবা খেলায় একটি বড় ধরনের জুয়া। কাস্পিয়ানের এ অস্থিতিশীলতা রাশিয়া, ইরান, ইউক্রেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের স্বার্থ ও কৌশলকে প্রভাবিত করছে। ঝুঁকিটা বড়ভাবেই নিয়েছে ইসরাইল। খেলাটাও শুরু হয়েছে তার হাত দিয়ে।

গত ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে বাণিজ্য তরী আন্নার ওপর হামলার ঘটনাটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়। ঘটনার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একে ‘ইসরাইলের উসকানিতে ইউরোপকে যুদ্ধে টেনে আনার জন্য জাতিসংঘ সনদের এক সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন। যদিও এ বিষয়ে ইসরাইল কৌশলগত নীরবতা পালন করে এমন ভাব ধরে, যেন সে এর কিছুই জানে না।

এর জবাবে ইরান প্রথমে ইউক্রেনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তবে কিয়েভের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার পর তেহরান আপাতত সামরিক হামলা স্থগিত রাখে। তা সত্ত্বেও, প্রাণঘাতী ক্ষতিপূরণের দাবি এবং উত্তেজনার রেশ এখনো রয়ে গেছে। যে কোনো সময় তা বিস্ফোরিত হতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের সহ-সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ট্রিতা পার্সির মতে, ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ইসরাইলের পরিকল্পনায় ইউক্রেনের এক দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক চাল। এর ফলে ইউক্রেনের অস্ত্র ঘাটতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসবে, ইরান যুদ্ধে জড়িত হওয়ার কারণে ইউক্রেনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যে মনোযোগ সরে গিয়েছিল, তা ফিরে আসবে। আর কাস্পিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আসবে। রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে একসঙ্গে নামবে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল-ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ার কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ এবং মার্কিন সামরিক সহায়তা ইউক্রেন থেকে সরে আসছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত অনেক গোলাবারুদ এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ফেরত নিয়ে ইসরাইলকে দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রশাসন মনে করছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দুই যুদ্ধকে এক করতে পারলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়াতে বাধ্য হবে। ইউক্রেন বার্তা দিতে চায়, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আপনার শত্রু ইরানের বিরুদ্ধে লড়ছি, তাই আপনি ইউক্রেনে আমাদের সাহায্য করুন।’ কিয়েভের যুক্তি হলো, রাশিয়ার যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নয়; ইরান, উত্তর কোরিয়া ও অন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতায় এটি বৃহত্তর স্বৈরতান্ত্রিক জোটের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

কাস্পিয়ান সাগর যদি উত্তপ্ত হয়, ইসরাইলের লাভ নানামুখী। প্রথমত, এর মাধ্যমে সে ইরানকে প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। ইসরাইল ইরানকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ইউরোপীয় নিরাপত্তারও অংশীদার-হুমকি হিসাবে উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমর্থন ধরে রাখা সম্ভব হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতাকে একই নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জের অংশ হিসাবে দেখতে শুরু করেছে। এতে ইসরাইলের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো সহজ হয় যে, ইরানের বিরুদ্ধে তার অবস্থান বৃহত্তর পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অংশ। এছাড়া আঞ্চলিক জোট ও অস্ত্রবাজারে সুবিধা পাবে ইসরাইল। ইরানকে অভিন্ন হুমকি হিসাবে দেখিয়ে ইসরাইল আরব দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে পারে। একইসঙ্গে ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি ও ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তির চাহিদাও বাড়তে পারে।

অবশ্য, ওয়াশিংটনও দুই সংঘাতকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখে না। মার্কিনিরা এ দুই যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ঠেকাতে চায়, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, এবং সেই সঙ্গে মিত্রদের মধ্যে সামরিক সমন্বয় বাড়ানোর পথ খুঁজছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ‘শাহেদ ড্রোন’ দিয়ে সহযোগিতা করার কারণে ইরানের ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড বা সম্পদে ইরানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের কারণে ইউরোপকে এ যুদ্ধে আরও সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব হবে।

মার্কিন জনমতে গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে ইসরাইলের ভাবমূর্তি বেশ কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন জনগণের মধ্যে ইউক্রেনের প্রতি এখনো সহানুভূতি রয়েছে। যুদ্ধটি যদি ‘ইসরাইল রক্ষা’ থেকে ‘ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিশ্ব রক্ষা’র যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তেল আবিব তাদের ওপর থেকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারবে।

ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্ক কখনো মসৃণ ছিল না। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তাদের এক টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের অধ্যাপক লানা রাভান্দি-ফাদাইয়ের মতে, দীর্ঘকাল ইরানিদের স্মৃতিতে রাশিয়া কোনো সুহৃদ বা অংশীদার ছিল না; বরং সীমান্তে চেপে বসা এক পরাশক্তি ছিল।

তবে সময় ও বৈশ্বিক কাঠামোর পরিবর্তনে এ সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পর শাহের আমলে ওয়াশিংটনের প্রাধান্য বাড়লেও ১৯৬০-এর দশক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইস্পাহান ইস্পাত কারখানা ও নানা অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা করে। উভয় দেশই এখন আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন। গত বছর স্বাক্ষরিত ২০ বছর মেয়াদি ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ চুক্তির মাধ্যমে মস্কো ও তেহরান বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের টিকে থাকার পথ সুগম করেছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তায় কাস্পিয়ান সাগর এবং পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি, উভয়েরই ভূমিকা অপরিসীম।

কাস্পিয়ান সাগর হলো উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রণালি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত জলাশয়। কাস্পিয়ান সাগরে আজারবাইজান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, রাশিয়া ও ইরানের অংশীদারত্ব রয়েছে। ২০১৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী, বাইরের কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি এখানে বেআইনি। কিন্তু ড্রোন প্রযুক্তির যুগে দূর থেকে কাস্পিয়ানের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানা এখন অনেক সহজ হয়ে পড়েছে।

কাস্পিয়ানে ইউক্রেনীয় হামলার পরপরই ইরান মিসরের বন্দরনগরী দামিয়াত্তায় একটি দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালায়। বিশ্লেষক ট্রিতা পার্সির মতে, এর মাধ্যমে ইরান বার্তা দিয়েছে যে, যদি পশ্চিমা মদদে কাস্পিয়ান সাগরে নতুন ফ্রন্ট খোলা হয়, তবে ইরানও লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর বা নতুন ভৌগোলিক এলাকায় তাদের অপ্রথাগত বা অপ্রতিসম যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। ইরান বুঝতে পারছে, শুধু কাস্পিয়ান বা হরমুজের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তারা মধ্য এশিয়া হয়ে চীন ও প্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বিকল্প পাইপলাইন, রেলপথ ও বাণিজ্য রুট তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এই নতুন ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে আরও ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগতে পারে।

কাস্পিয়ান সাগরে চাল চালার এই ‘জুয়া’ বিশ্বরাজনীতির সমীকরণগুলোকে অত্যন্ত দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কাস্পিয়ান কোনো বিচ্ছিন্ন জলাশয় নয়; এটি এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যকার একটি ভূ-রাজনৈতিক সেতু। এখানে ঘটা যে কোনো সংঘর্ষ ‘অস্থিতিশীলতার ভূগোলকে’ বিস্তৃত করছে। ইউক্রেন, ইসরাইল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কাস্পিয়ানকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে চায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া শুধু ইরান বা রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পুরো ইউরেশিয়া অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন