রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

শিরোনাম

ধ্বংসস্তূপের নিচে দুই বছরের সন্তান, অপেক্ষায় মা

রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

দুই দফা শক্তিশালী ভূমিকম্পে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে ঘর, হারিয়ে যায় পুরো পরিবার। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে এখনো অপেক্ষা করছেন এক মা। তার বিশ্বাস, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা প্রায় দুই বছরের ছেলে এখনো বেঁচে আছে। ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যই এখন দেশটির নানা প্রান্তে।

দেশটিতে গত বুধবার রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের পরপরই কর্মস্থল থেকে ছুটে বাড়ি ফেরেন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও। উদ্দেশ্য ছিল প্রায় দুই বছরের ছেলে সান্তিয়াগোকে নিয়ে আসা।

সান্তিয়াগো তখন তার বাবা রামসেস মেনদোজার সঙ্গে লা গুয়াইরায় দাদা-দাদির বাসায় ছিল। সেখানে পৌঁছে আন্দ্রেইনা দেখেন, পুরো ভবনটি ধসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

তার ভাসুর স্যামুয়েল মেনদোজা তখন ভেঙে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে স্বজনদের খুঁজছিলেন।

শনিবার ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দ্রেইনা জানান, তার ছেলে, জীবনসঙ্গী, শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদা-দাদি শ্বশুর এবং ননদ— সবাই এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। তবুও তিনি আশা ছাড়েননি।

আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েল জানান, ভবনটিতে আরও দুটি শিশু আটকা পড়ে আছে। তাদের একজন নয় বছরের লুকাস এবং অন্যজন তিন বছরের আরানজা।

শনিবার এল সালভাদর ও স্পেন থেকে আসা উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেখান থেকে কাউকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ভূমিকম্পের পরের সকালে স্যামুয়েল জানান, তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীর কণ্ঠ শুনেছিলেন।

‘প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি কী বলছিলেন। শুধু একটি শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম— ‘বাঁচান’।’

পরদিন আন্দ্রেইনা আবার সেখানে ফিরে এসে একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান।

চোখে অশ্রু নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি আমার ছেলে বেঁচে আছে। আমি বিশ্বাস করি আমি যে কান্নার শব্দ শুনেছি, সেটি আমার ছেলেরই। আমি জানি, আমার ছেলে এবং তার পরিবারের সবাই এই বিপর্যয় থেকে ফিরে আসবে।’

আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েলের মতো হাজারো মানুষ এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন। বিশাল দুটি ভূমিকম্পে দেশজুড়ে শত শত ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরায় অনেক পরিবার খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রিয়জনদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই কয়েক রাত ঘুমাননি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বজনদের ডাকতে ডাকতে অনেকের কণ্ঠস্বর ভেঙে গেছে।

শুক্রবার দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ এসে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

উদ্ধারকারী দল দিনরাত কাজ করলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ভেনেজুয়েলা যে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না, তা স্পষ্ট। দীর্ঘদিন নানা সংকটে থাকা দেশটির জন্য এই দুর্যোগ আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হোটেল এডওয়ার্ড এলাকায় পৌঁছানোর পর বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ অনুভব করেন এ প্রতিবেদক। চারদিকে এমন ধ্বংসযজ্ঞ ছিল যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারবে— এমন আশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল।

শুধু লা গুয়াইরা শহরেই অন্তত ৫০টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে, পুরো অঞ্চলে ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ এই ভূমিকম্পকে গত ১২৩ বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন।

সরকারি হিসাবে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২৩৮ জন। তবে এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে জরুরি সেবাকর্মীরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।

লা গুয়াইরার বিভিন্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে ১৪ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং পুরো এলাকাকে নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।

শুরুর দিকে উদ্ধারকাজে মাত্র একটি ছোট ট্র্যাক্টর দেখা গেলেও পরে দুর্গম ও ভাঙাচোরা সড়ক পেরিয়ে ভারী যন্ত্রপাতিও ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে শুরু করে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের কান্না ও আর্তনাদ থামানোর চেষ্টা করা হলেও মানুষের ভিড়, মোটরসাইকেলের শব্দ আর উৎকণ্ঠার চিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে উঠছিল।

এদিকে স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনমতো ব্যবহার করার জন্য কাপড়চোপড়ও স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যাতে দুর্গত মানুষ সেগুলো নিতে পারেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন