যুক্তরাজ্যের বিচারিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করে ফিলিস্তিনপন্থি চার আন্দোলনকারীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ৪ থেকে ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এবারই প্রথম—সন্ত্রাসবাদের কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতার প্রমাণ ছাড়াই—কেবল সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের (ক্রিমিনাল ড্যামেজ) দায়ে অভিযুক্ত আন্দোলনকারীদের ওপর ‘সন্ত্রাসবাদের সংশ্লিষ্টতার তকমা সেঁটে দেওয়া হলো। খবর মিডেল ইস্ট আইর।
গত ৬ আগস্ট ২০২৪-এ ব্রিস্টলের কাছে ইসরাইলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস ইউকে’-এর একটি কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর ও বিক্ষোভ করার দায়ে গত মাসে লিওনা কামিও, স্যামুয়েল কর্নার, ফাতেমা রাজওয়ানি এবং শার্লট হেড নামের চার ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করে জুরি বোর্ড। তবে জুরিদের শুনানিতে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। একই মামলায় জর্ডান ডেভলিন এবং জো রজার্স নামের অপর দুই আন্দোলনকারীকে খালাস দেওয়া হয়।
শুক্রবার (১২ জুন) মামলার রায় ঘোষণার সময় প্রধান বিচারপতি জেরেমি জনসন দণ্ডপ্রাপ্তদের অপরাধের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসবাদের সংশ্লিষ্টতা’ যুক্ত করেন। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দেওয়া এক প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিচারপতি জনসন দাবি করেছিলেন, অস্ত্র সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে ইসরাইল সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন এই আন্দোলনকারীরা, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তবে জুরি বোর্ডের রায় দেওয়ার আগ পর্যন্ত এই তথ্যটি গোপন রাখা হয়েছিল।
বিচারপতি জনসন তার রায়ে বলেন, সেন্টেনসিং অ্যাক্টের ৬৯ ধারা অনুযায়ী তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে বিবাদীরা রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ‘গুরুতর সম্পত্তি ভাঙচুর’ করেছেন। একই সঙ্গে তারা এলবিট সিস্টেমস ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের একাংশকে ‘ভীত-সন্ত্রস্ত’ করার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
বিচারকের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর শার্লট হেড ও লিওনা কামিওকে ৬ বছর, ফাতেমা রাজওয়ানিকে ৫ বছর ৮ মাস এবং স্যামুয়েল কর্নারকে সর্বোচ্চ ৮ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় শোনার পর কাঠগড়ার ওপাশে থাকা পরিবারের সদস্য ও সমর্থকেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং কাচের দেয়ালে আঘাত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালত কক্ষ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় লিওনা কামিও ফিলিস্তিনি কবি মারওয়ান মাখুলের একটি বিখ্যাত কবিতা আওড়ে বলেন, পাখির গান শুনতে হলে ড্রোনগুলোকে অবশ্যই শান্ত হতে হবে।
এদিকে রায়ের ঠিক কয়েক দিন আগে রাষ্ট্রপক্ষের জমা দেওয়া একটি ফরেনসিক প্রতিবেদন নিয়ে আদালত কক্ষে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আন্দোলনকারীদের কারণে এলবিট সিস্টেমসের আইটি সিস্টেম, সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোসহ প্রায় ১২ লাখ পাউন্ডের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদও রয়েছে।
আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী রাজীব মেনন কেসি এই প্রতিবেদনের সময়জ্ঞান নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। একে ‘একেবারে শেষ মুহূর্তের চাল’ উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঘটনা ঘটার দীর্ঘ ২০ মাস পর কেন এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো? তিনি বলেন, এর ফলে আসামিপক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনটিকে ‘গুজব ও মনগড়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, কারখানার যেসব অংশে আন্দোলনকারীরা প্রবেশই করেননি, সেখানকার ক্ষয়ক্ষতিও তাদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে।
রাজীব মেনন আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ একই সঙ্গে দুই সুবিধা নিতে পারে না। মূল শুনানির সময় তারা আসামিদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিবাদের উদ্দেশ্যসংক্রান্ত প্রমাণগুলোকে আদালতে উপস্থাপন করতে দেয়নি। অথচ এখন সাজা দেওয়ার সময় ঠিকই সেই ‘মতাদর্শ’কে টেনে এনে সাজা বাড়াচ্ছেন। এটি আসামিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এই রায়কে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর সমর্থনে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শনের অভিযোগে পুলিশ সেখান থেকে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে।






চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন