রবিবার, ০৯ আগষ্ট ২০২৬

শিরোনাম

ভারতে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার নেপথ্যে ‘পরীক্ষার চাপ ও প্রশ্ন ফাঁস’

রবিবার, আগস্ট ৯, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

টানা কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর জুলাইয়ের শেষের দিকে ভারত সরকার যখন তাদের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেয়, তখন দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্‌যাপন শুরু হয়। বারবার পরীক্ষা বাতিল এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নেতৃত্বাধীন এ গণবিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন সারা দেশের শিক্ষার্থীরা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে পরীক্ষার চাপ বহুগুণ বেড়েছে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর প্রকাশিত ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথস অ্যান্ড সুইসাইডস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যেখানে ৮,০৬৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,৪৮৮ জনে—যা প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। পারিবারিক সমস্যার পর, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়াকেই শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেসব পরিবার শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং পরীক্ষার কেলেঙ্কারির কারণে তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, টেলিভিশনের পর্দায় এই বিক্ষোভের দৃশ্য তাদের মনে মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ খুশি হয়েছেন এই ভেবে যে, ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীরা হয়তো এমন নির্মম পরিণতি থেকে রক্ষা পাবে; আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এমন একটি পদক্ষেপ নিতে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগল।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এমন চার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা জানিয়েছেন তাদের সন্তানদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এবং বর্তমানে তারা কেমন বোধ করছেন।

যমজ বোন এবং চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় অংশিকা পাণ্ডে ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে শান্ত ও দায়িত্বশীল সদস্য, এমনটাই বলছিলেন তার বাবা। পড়াশোনার বইগুলো এখনো পরিপাটি করে সাজানো, ব্যাগ আর অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডগুলো ঠিক সেভাবেই ঝুলছে, যেভাবে সে শেষবার রেখে গিয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল নিজ এলাকার একজন চিকিৎসক হওয়া, যাতে একদিন চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত গরিব মানুষদের সাহায্য করতে পারে।

অংশিকা প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার বেশি পড়াশোনা করতেন, একটি দোকানে প্রায় ছয় ঘণ্টা খণ্ডকালীন কাজ করতেন এবং রাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না।

মেডিকেলে ভর্তির জন্য এ বছর তিনি তৃতীয়বারের মতো জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় (নিট-Neet) অংশ নেন। ৩ মে পরীক্ষা দেওয়ার পর তিনি বেশ আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ১২ মে তিনি জানতে পারেন, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং পুনরায় পরীক্ষা দিতে হবে।

দিল্লিতে ট্যাক্সিচালকের কাজ করা অংশিকার বাবা ইন্দ্রধর পাণ্ডে বলেন, অংশিকা ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। সে এ বছর কলেজে ভর্তি হওয়ার আশা করেছিল এবং পরীক্ষা ভালো হওয়ায় খুব খুশিও ছিল। কিন্তু পরীক্ষা বাতিলের পর যখন আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি, তখন সে শুধু একটি কথাই আক্ষেপ করে বলছিল—কীভাবে সে আবারও একটি ভালো পরীক্ষা দেওয়ার আশা করতে পারে।

এরপর অংশিকা শান্তই ছিলেন। ঘরের কাজ করতেন এবং সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মিশতেন। কিন্তু দুদিন পর, ১৪ মে, যখন সবাই কাজে বেরিয়ে যায় এবং তার যমজ বোন ও ছোট ভাই ঘুমাচ্ছিল, তখন সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।

অংশিকার স্বপ্ন ছিল তার পরিবারকে, বিশেষ করে ভাইবোনদের, বস্তির জীবন থেকে বের করে আনা। তার ছোট বোন প্রগতি এখন সেই স্বপ্ন পূরণের আশা রাখে এবং দুই বোন মিলে এই বিষয়ে কাটানো মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করে। অংশিকার আঁকা ছবি এবং নিজেকে অনুপ্রাণিত করার জন্য ঘরের দেয়ালে লিখে রাখা ইতিবাচক বার্তাগুলোই এখন তার পরিবারের বেঁচে থাকার সম্বল, যা তারা কোনোভাবেই হারাতে চায় না।

সুফি শাহীন (১৯), দিল্লি

২৫ অক্টোবর ২০২৪-এর সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে সুফি শাহীন তার চুল সোজা করে এবং নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিন্সটি পরে। যাওয়ার সময় সে তার মায়ের কাছে ১০ রুপি চায়, অথচ অন্য দিনগুলোতে সে ১০০ রুপি চাইত। এরপর সে তার জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামিনেশন (Jee) কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।

তার মা সুলতানা খাতুন তাকে খালি পেটে বাড়ি থেকে বের হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে শাহীন উত্তর দেয়, সে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু এর ঠিক বিশ মিনিট পর, বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে কোচিং সেন্টারের সাত তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে সে।

তার মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও, সেই দিনের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেননি খাতুন। তিনি তীব্র বিষণ্নতা ও মাথাব্যথার চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মেয়ের স্কুলের ছবিগুলো দেখতে দেখতে খাতুন বলেন, চার সন্তানের মধ্যে ও ছিল আমার একমাত্র মেয়ে এবং অনেকটা বন্ধুর মতো। আমি যখনই বাড়ি থেকে বের হতাম, সে আমাকে সাজিয়ে দিত। পড়াশোনা এবং ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রতি প্রবল আবেগ থাকলেও, সে সাজগোজ করতে ভালোবাসত এবং বাড়ির সবাইকেও সাজতে বাধ্য করত।

একজন টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বাবার সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বাবা-মা এবং তিন ভাইয়ের সঙ্গে থাকা শাহীনের স্বপ্ন ছিল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া এবং সমাজের ছেলেদের চেয়েও ভালো কিছু করে দেখানো, জানান তার মা।

খুব দ্রুত যেকোনো কিছু শিখতে পারা এবং প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী শাহীন নিজে নিজেই ছবি আঁকা শিখেছিল, এমনকি জাপানি ও কোরিয়ান ভাষাও বলতে পারত। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সে বেশ মানসিক চাপে ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয়বারের চেষ্টায়ও উত্তীর্ণ হতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সে আতঙ্কে ভুগছিল।

ভারতের ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি যখন Jee পরীক্ষার সিলেবাসে পরিবর্তন আনে, তখন শাহীন টানা কয়েক দিন ঘুমাতে পারেনি। সে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকত, ভাই ও সেরা বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় কাঁদত। বাবা-মায়ের কাছে লেখা এক চিরকুটে সে ক্ষমা চেয়ে ছোট ভাই মাসুমকে তাদের স্বপ্ন পূরণের অনুরোধ করে যায়।

খাতুন বলেন, প্রায় দুই বছর পর, মাসুম তার CUET (কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট) পরীক্ষায় পুরো ভারতে ১৮৮তম স্থান অর্জন করেছে। কিন্তু এই আনন্দ উদ্‌যাপন করার জন্য আজ আমাদের শাহীন নেই।

প্রদীপ কুমার মাহিচ (২২), রাজস্থান

এই বছর আমার ডাক্তার হওয়া স্বয়ং ঈশ্বরও আটকাতে পারবেন না—৩ মে নিট (Neet) পরীক্ষার ঠিক পরক্ষণেই নিজের বাবাকে কথাগুলো বলেছিলেন ২২ বছর বয়সি প্রদীপ মাহিচ। এটি ছিল তার চতুর্থ চেষ্টা এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো, সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পুনরায় পরীক্ষার ঘোষণায় তার হৃদয় ভেঙে যায়।

প্রদীপের বাবা রাজস্থানের সিকার জেলার কৃষক রাজেশ কুমার বলেন, পরিবারের কেউ কখনো এত বড় স্বপ্ন দেখেনি। কুমার তার কৃষিজমির বড় একটি অংশ বিক্রি করে দেন এবং কৃষকদের ফসল ঋণ প্রকল্পের আওতায় ১১ লাখ রুপি (৮ হাজার ৬০০ পাউন্ড) ঋণ নেন।

কুমার বলেন, নিট প্রস্তুতির প্রধান কেন্দ্র সিকার আমাদের গ্রাম থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার পথ। আমার বড় মেয়ে ববিতা, যে পুলিশের চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং আমার ছেলে—দুজনই সিকারে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে পড়াশোনা করছিল। এটি ছিল তার কোচিংয়ের চতুর্থ বছর এবং জমি বিক্রির টাকা ও ঋণ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছিল। আমি তাদের মাসে ২৫০ পাউন্ড খরচ এবং প্রদীপের বার্ষিক কোচিং ফি ৪,০০০ পাউন্ড পাঠাতাম, আর বলতাম টাকার চিন্তা না করে শুধু পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে।

তিনি আরও বলেন, প্রদীপ আমাকে বলেছিল, বাবা, কলেজে যাওয়ার আগে আমরা বড় করে উদ্‌যাপন করব। আর একদিন আমি গ্রামের মানুষের সেবা করতে ফিরে আসব।

১৫ মে, প্রতিদিনের মতো কুমার বাসে করে সিকারে তার দুই সন্তানের জন্য দুধ ও দই পাঠান। সকাল সাড়ে ৯টায় প্রদীপ তা নিয়ে বাসায় ফেরে এবং বোনকে জানায় সে দুপুরের খাবার তৈরিতে সাহায্য করবে। কিন্তু তার বোন যখন গোসল করছিল, তখন সে গলায় ফাঁস দেয়। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার বোন পড়াশোনায় বিরতি দিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে।

টেলিভিশনের পর্দায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেখে কুমার বলেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করায় তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেন, এর একটি সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত যাতে অন্য কোনো পরিবারকে আমাদের মতো এমন নির্মম পরিণতি ভোগ করতে না হয়।

এস অনিতা (১৭), তামিলনাড়ু

এস অনিতা তামিলনাড়ুর আরিয়ালুর জেলার এক সুবিধাবঞ্চিত নিম্নবর্ণ বা দলিত সম্প্রদায়ের মেয়ে ছিলেন। একজন দিনমজুরের ঘরে জন্ম নেওয়া অনিতা মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে হারান। এরপর থেকে দাদা-দাদিই তাকে বড় করেন।

কিশোরী বয়সেই সে ডাক্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তার ভাই মণিরত্নম বলেন, এত অল্প বয়সেই সে তার লক্ষ্যে এত অবিচল ছিল যে, আমরা তাকে নিয়ে গর্ববোধ করতাম। সে জানত তার কী চাই এবং অন্য কোনো কিছুতেই সে কখনো মনোযোগ হারায়নি। সে কখনো কোনো পোশাক, গয়না বা খাবারের বায়না করত না—তার লক্ষ্য পরিষ্কার ছিল এবং সে তার পরিস্থিতি বুঝতে পারত।

স্কুলে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে সে ১০০ তে ১০০ পেয়েছিল এবং রাজ্যের প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু যখন সে নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ন্যূনতম নম্বরও পেল না, তখন সে বুঝতে পারল যে সে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সিলেবাসে পড়াশোনা করেছে।

তামিলনাড়ুর শিক্ষাব্যবস্থা ভিন্ন হওয়ায় তারা আগে থেকেই ভারতজুড়ে একই পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে আসছিল। রাজ্য সরকারের দাবি ছিল, এটি ফেডারেল কাঠামোকে ব্যাহত করছে। এর ফলে, ২০১৬ সালে রাজ্যটিকে নিট পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ২০১৭ সালে তা দেওয়া হয়নি। আর এই বছরই অনিতা পরীক্ষায় বসেছিল।

২০১৭ সালের ২২ আগস্ট ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যখন রায় দেয় যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি কেবল নিট পরীক্ষার মাধ্যমেই হবে, তখন সে সমস্ত আশা হারিয়ে ফেলে। ১ সেপ্টেম্বর, অনিতা তার দাদা-দাদির বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। তার আত্মহত্যার ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং রাজ্যজুড়ে, এমনকি দিল্লিতেও তীব্র বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।

গত মাসে রাজধানীতে হওয়া বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তার ভাই। জুলাইয়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনায় খুশি হলেও, তিনি যুক্তি দেন যে নিট পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ কোচিং ফি সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়, তাই সমস্ত পরীক্ষাই কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে রাজ্য সরকারের অধীনে পরিচালিত হওয়া উচিত।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন