চীন সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিং ছেড়েছেন। দুই দিনের সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও বাস্তব অর্জন ছিল সীমিত। খবর রয়টার্স।
২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করলেন। ওয়াশিংটনের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেইজিংয়ের সঙ্গে এই বৈঠক থেকে ট্রাম্প তাৎক্ষণিক সাফল্য আশা করেছিলেন, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা বাড়াতে।
সফরজুড়ে ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন—সামরিক কুচকাওয়াজ, ঐতিহাসিক উদ্যান পরিদর্শন এবং রাষ্ট্রীয় ভোজ। তবে পর্দার আড়ালে তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন শি জিনপিং। তিনি জানান, চীনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এই বিষয়টি ভুলভাবে সামাল দিলে তা সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি ট্রাম্প। পুরো সফরে তিনি অস্বাভাবিকভাবে সংযত ছিলেন এবং তার বেশিরভাগ মন্তব্যই ছিল শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিত্ব ও আতিথেয়তার প্রশংসা ঘিরে।
ঝংনানহাই কমপ্লেক্সে শেষ বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ছিল অসাধারণ সফর। আমি মনে করি, এখান থেকে অনেক ভালো কিছু এসেছে।’
রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে পরিবেশন করা হয় লবস্টার বল ও কুং পাও স্ক্যালপের মতো ঐতিহ্যবাহী চীনা খাবার।
ইরান ইস্যুতে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত
শুক্রবার (১৫ মে) বৈঠকের আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই সংঘাত কখনোই হওয়া উচিত ছিল না এবং এর চলমান থাকারও কোনো কারণ নেই।’ একইসঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানায় বেইজিং।
ট্রাম্প জানান, ইরান ইস্যুতে দুই নেতা ‘একই ধরনের অনুভূতি’ ভাগাভাগি করেছেন। তবে শি জিনপিং এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প আশা করেছিলেন চীন তার প্রভাব ব্যবহার করে তেহরানকে সমঝোতায় আনবে। কিন্তু বেইজিং সম্ভবত ইরানের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিতে আগ্রহী নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে চীন।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান নিয়ে চীনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি আসেনি।’
বোয়িং চুক্তি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি
ট্রাম্প দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে বাজারে প্রত্যাশিত প্রায় ৫০০ বিমানের চুক্তির তুলনায় এটি অনেক কম হওয়ায় বোয়িংয়ের শেয়ার ৪ শতাংশের বেশি পড়ে যায়।
এ ছাড়া কৃষিপণ্য বিক্রি ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অগ্রগতির কথা বলা হলেও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
চীনে এনভিডিয়ার উন্নত ‘এইচ২০০’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ বিক্রির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যদিও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে সফরে যোগ দিয়েছিলেন।
বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়েও অচলাবস্থা কাটেনি। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। এতে মার্কিন চিপ নির্মাতা ও মহাকাশ শিল্পে সংকট তৈরি হয়।
চলতি বছরের শেষ দিকে এই বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে কিনা, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।
তাইওয়ান নিয়ে কঠোর বার্তা
তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের সতর্কবার্তা সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের উপকূল থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরের স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে বেইজিং। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকিও দিয়ে আসছে তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আইন অনুযায়ী তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সামর্থ্য দিতে বাধ্য।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে।’
এদিকে তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সফরে হংকংয়ের কারাবন্দি গণমাধ্যম মালিক ও চীনবিরোধী সমালোচক জিমি লাইয়ের বিষয়টিও ট্রাম্প উত্থাপন করেন বলে জানান রুবিও। তবে বেইজিং এটিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করেছে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলেও দুই পক্ষই সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছে। বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে শি জিনপিং বলেন, ‘এ সম্পর্ককে কার্যকর রাখতে হবে এবং কখনো নষ্ট করা যাবে না।’



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন