যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র হামলায় আহত হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে দেখা বা শোনা যায়নি। গণমাধ্যমের দাবি, তার বাবা যেভাবে নিহত হয়েছিলেন, সেই একই ধরনের বিমান হামলা এড়াতে তিনি এখন চরম গোপনীয়তা ও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
গুপ্তহত্যার হুমকি মাথায় নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখন কোনো এক অজ্ঞাত ও সুরক্ষিত আস্তানায় লুকিয়ে আছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখানে যোগাযোগের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে খামেনির কাছে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো এক জটিল ‘কুরিয়ার বা রানার নেটওয়ার্ক’।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে এ অতি-গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনাকারী ইরানি কর্মকর্তারা খামেনির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারায় চরম বিপাকে পড়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির বিস্তারিত রূপরেখা বা পূর্ববর্তী চুক্তিগুলো সামনে আসতে দেরি হওয়ার মূল কারণ এটাই। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যেকোনো নতুন প্রস্তাব পাঠানো হলে তা সর্বোচ্চ নেতার কাছে পৌঁছাতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে মার্কিন প্রশাসনকে উত্তরের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অবশ্য সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান বা ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কিত এ গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ হ্যান্ডেলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির আভাস দিয়ে পোস্ট করার আগেই বর্তমান খসড়া চুক্তির মূল বিষয়গুলোতে সম্মতি দিয়েছিলেন মোজতবা খামেনি।
কোথায় আছেন মোজতবা খামেনি?
মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় আহত হওয়ার পর থেকেই মোজতবা খামেনি জনসমক্ষ থেকে পুরোপুরি দূরে আছেন। গণমাধ্যমের দাবি, তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির (যিনি ১৯৮৯ থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরান শাসন করেছেন) পরিণতি এড়াতেই তিনি এই চরম পন্থা বেছে নিয়েছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালীন ইরান সরকারের ভেতর থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে খুঁজে বের করে খতম করেছে।
ফলশ্রুতিতে, ইরানের বর্তমান শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই এখন প্রকাশ্যে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটাতেন মাটির নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত বাঙ্কারে এবং কেবল অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা রসিকতা করে বলেন, তারা যেভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে, তা দেখতে অনেকটা সিটকম (কমেডি নাটক) দেখার মতো। তারা নিজেরাও এই যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে সম্পূর্ণ বিরক্ত।
তবে সব নেতার মধ্যে সবচেয়ে কঠোর ও সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছেন খামেনি নিজে। এমনকি ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও জানা নেই তিনি ঠিক কোথায় আছেন এবং তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কোনো মাধ্যমও তাদের কাছে নেই। তার অবস্থান গোপন রাখতে তৈরি করা বিশেষ কুরিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই কেবল বার্তা আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ঠিক এ কারণেই আপনারা শুনতে পাচ্ছেন যে—‘সর্বোচ্চ নেতা চুক্তির কাঠামোতে সম্মত হয়েছেন’ কিংবা ‘আমরা চূড়ান্ত পয়েন্টগুলোর জবাবের অপেক্ষায় আছি’। কারণ তার কাছে পৌঁছানো প্রতিটি তথ্যই পুরোনো হয়ে যায় এবং তার প্রতিক্রিয়া আসতেও অনেক সময় লাগছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামেনি অবশ্য তার অধীনস্থদের চুক্তির মূল শর্তগুলো বুঝিয়ে দিয়েছেন। কোন কোন বিষয়ে তারা আলোচনা করতে পারবেন এবং কোন বিষয়গুলো নিয়ে একেবারেই কথা বলা যাবে না, সেই নির্দেশনাও দিয়ে রেখেছেন তিনি।



চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন