বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দিচ্ছে? মুখ খুললেন জেডি ভ্যান্স

বুধবার, জুন ১৭, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল দিচ্ছে—এমন খবরকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন ইরানকে সরাসরি কোনো টাকা দিচ্ছে না; বরং ইরান যদি চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলে, তবে অন্যান্য দেশকে সেখানে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রশাসন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যস্থতায় হওয়া এই শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল পেতে যাচ্ছে—এমন কিছু খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জেডি ভ্যান্সের তরফ থেকে এমন বার্তা এলো।

‘দ্য মেগান কেলি শো’-তে সাংবাদিক মেগান কেলির এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স ব্যাখ্যা করেন যে, চুক্তির আওতায় ইরান যদি শর্ত মেনে চলে এবং নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনে, তবে দেশটির ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। এর ফলে সেখানে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে এবং ক্যাশ ফ্লো বা অর্থের প্রবাহ বাড়বে।

জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘ধরা যাক সংযুক্ত আরব আমিরাত আমাদের অন্যতম সেরা আঞ্চলিক মিত্র। তারা যদি ইরানের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করতে চায়, তবে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় আমাদের বিদ্যমান কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা সেটি করতে পারবে না।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এখন প্রশ্ন হলো, আমিরাত কি সত্যিই ইরানে বিনিয়োগ করবে, কিংবা আমেরিকা কি তাদের তা করতে দেবে? ইরান তাদের আচরণ পরিবর্তন না করা পর্যন্ত উত্তর হলো—না। তাই যারা বলছেন, ‘আপনারা ইরানকে টাকা দিচ্ছেন,’ তারা ভুল বলছেন। আমরা কেবল বলছি, ইরান যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন করে, তবে আমরা অন্যান্য দেশকে তাদের দেশ পুনর্গঠন এবং জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য বিনিয়োগের সুযোগ দেব।’

এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মার্কিন-ইরান কাঠামোগত চুক্তিতে ইরানকে বিনিয়োগের আওতায় আনতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বেসরকারি (প্রাইভেট) তহবিলের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। চুক্তি সম্পর্কে সরাসরি অবগত এমন একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, ইতোমধ্যেই এই অঙ্কের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া গেছে।

তবে পরিকল্পনাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো উভয় পক্ষকে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়া।

সূত্রটি আরও স্পষ্ট করেছে যে, এই নতুন তহবিলটি একটি সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগ মাধ্যম। এটি কোনো সরকারি পুনর্গঠন বা ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি নয়। এতে মার্কিন সরকারের কোনো টাকা বা অনুদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার বেসরকারি কোম্পানিগুলো এই অর্থায়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিনিয়োগগুলো মূলত জ্বালানি, লজিস্টিকস, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পরিবহন খাতের জন্য নির্ধারিত।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই মূলত ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল) নামের এই মেকানিজমটি গড়ে উঠেছে।

একটি ইরানি সূত্রের মতে, আঞ্চলিক দেশগুলো বিভিন্ন উপায়ে এতে অবদান রাখবে। যার মধ্যে রয়েছে ঋণ নিশ্চিত করা, ক্রেডিট লাইন বা ঋণের সীমা তৈরি করা অথবা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো যেমন—মোবারাকে স্টিল কমপ্লেক্স, শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্গঠনে সরাসরি অর্থায়ন করা।

গত রোববার (১৪ জুন) মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানান, তারা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক কাঠামোতে সম্মত হয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ব্যাপারেও সম্মতি এসেছে।

এই তহবিল যেভাবে ইরানকে সাহায্য করবে

একটি সিনিয়র ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, তেহরান মূলত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল, কিন্তু ওয়াশিংটন তা সরাসরি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও, গত চার দশকে ইরান উল্লেখ করার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ পায়নি। একের পর এক মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা বৈশ্বিক পুঁজি বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। অথচ দেশটির রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুদ। ৯২ মিলিয়নেরও বেশি তরুণ ও শিক্ষিত জনসংখ্যা এবং বৈচিত্র্যময় শিল্প খাতের কারণে পেট্রোকেমিক্যাল, খনি, পর্যটন এবং কৃষির মতো ক্ষেত্রে ইরানের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

চুক্তির শর্তাবলী

সূত্রটি জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ তহবিলটি ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সমান্তরাল আলোচনার পথ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

একটি চূড়ান্ত এবং সন্তোষজনক চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই তহবিলটি গঠন বা কার্যকর করা হবে না। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো হবে। সূত্রটি জানায়, ‘চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই কেবল তহবিলটি তৈরি হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে তহবিল পরিচালনাকারীরা প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও পরিধি নির্ধারণের জন্য ইরানি পক্ষ এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করবেন।’

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন