ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। টানা ভারী বৃষ্টি ও নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। রাজ্য সরকার বলছে, গত ৬০ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।
আসামের জোরহাট জেলার ১৮ বছর বয়সি সালিনে পাত্রো জানান, ১৯ জুলাই সকালে বৃষ্টি দেখলেও তিনি কল্পনাও করতে পারেননি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার পরিবারের সবকিছু ভেসে যাবে। দুপুরের দিকে হঠাৎ পানির তীব্র স্রোত ও মানুষের চিৎকার শুনে তিনি বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। পরে কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করতে বাড়িতে ফিরে গেলে দেখেন, পুরো ঘরটি স্রোতে ভেসে গেছে।
বর্তমানে একটি ত্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করা সালিনে বলেন, আমাদের টেলিভিশন, আলমারি, সোফা—কিছুই অবশিষ্ট নেই। এমনকি পানি খাওয়ার একটি গ্লাসও উদ্ধার করতে পারিনি। এই বন্যা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।
আসামে প্রতি বছরই বন্যা দেখা দিলেও এবারের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের জাতীয় বন্যা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা বন্যাপ্রবণ। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর অর্ধশতাধিক উপনদী বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, উজানে বন উজাড় এবং পুরোনো বাঁধের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি হিসাবে, গত চার সপ্তাহে বন্যায় অন্তত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত এক সপ্তাহেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫৮ জন। এখনও প্রায় ৪০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখের বেশি মানুষ এবং হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে ত্রাণকেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, নাগাল্যান্ড ও আসামের বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৪৩৫ থেকে ৪৯০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে নদীগুলোর পানি নজিরবিহীন গতিতে বৃদ্ধি পায় এবং বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিবসাগর, চরাইদেও ও জোরহাট জেলা।
শিবসাগরের হোলাং কাটনি গ্রামের বাসিন্দা রেখামণি গগৈ ও তার সাত বছর বয়সি ছেলে বন্যার পানিতে আটকা পড়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা একটি আমগাছে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে ছিলেন। চারদিকে অন্ধকার আর উত্তাল পানির মধ্যে খাদ্য ও পানীয় ছাড়াই রাত কাটানোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ছেলেকে বাঁচানোর জন্য সাহস হারাইনি। পরদিন সকালে উদ্ধারকারীরা তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
এদিকে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান শেষে এখন পুনর্বাসন কার্যক্রমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে ঘরবাড়ি হারানো হাজারো পরিবারের মতো সালিনে পাত্রোর পরিবারও জানে না, আবার নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তাদের কত বছর অপেক্ষা করতে হবে।






চলমান নিউইয়র্ক ফেসবুক পেজ লাইক দিন
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন