রবিবার, ২৩ আগষ্ট ২০২৬

শিরোনাম

গাজায় একাকী বেঁচে থাকা এক প্রজন্মের টিকে থাকার সংগ্রাম

রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

প্রতিদিন সকালে ১৩ বছর বয়সি জানা আল-মুতৌককে একা একাই ঘুম থেকে উঠতে হয়। ফিলিস্তিনি এই কিশোরী নিজেই নিজের সকালের নাস্তা তৈরি করে, কাপড় কাচে এবং স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। কিছুদিন আগেও এই ছোট ছোট কাজগুলো তার মা করে দিতেন।

জানা বলে, ‘মা আমাদের ঘুম থেকে তুলতেন, নাস্তা বানিয়ে দিতেন, চুল আঁচড়ে দিতেন। এখন আমাকে সবকিছু একা হাতেই করতে হয়।’

২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর গাজায় এক ইসরাইলি হামলায় পরিবারের সবাইকে হারানোর পর জানা আল-মুতৌক-ই এখন তার পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য। জাবালিয়ার একটি আবাসিক ভবনে চালানো সেই হামলায় তার বাবা আহমেদ ও মা হেবা, জমজ বোন সাজা এবং দুই ছোট ভাই হোসেন (৮) ও মোহাম্মদ (৪) নিহত হন।

ফিলিস্তিনে প্রায় তিন বছর ধরে চলা ইসরাইলি বিমান হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর বাবা-মা, ভাইবোন বা আত্মীয়স্বজন হারিয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়া হাজার হাজার শিশুর একজন জানা। গাজার ২২ লাখ মানুষের বেশিরভাগই বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, হারিয়েছে তাদের ঘরবাড়ি, স্কুল এবং সুশৃঙ্খল স্বাভাবিক জীবন। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক বিষাদগ্রস্ত প্রজন্ম, যাদের জোরপূর্বক বাধ্য করা হচ্ছে শোক, বাস্তুচ্যুতি এবং গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে অকালেই বড় হয়ে উঠতে।

সেই দিনের হামলায় জানার আপন ও চাচাতো-খালাতো ভাইবোনসহ নিজ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনসহ আরও ৩৫ জন সদস্য নিহত হন। সেদিন রাতে অসুস্থ থাকার কারণে রাস্তার বিপরীতে দাদির বাড়িতে ঘুমাতে যাওয়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় জানা।

শেষ রাতের ঠিক আগে যখন বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে, সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। জানা সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলে, ‘আমাদের বাড়িটি আর সেখানে ছিল না। আমি বাবা-মাকে ডাকতেই থাকি, ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে তাদের ডেকেছিলাম। কেউ কোনো উত্তর দেয়নি।’

গাজার মনোবিজ্ঞানী সেরিন আল-আবসির মতে, এই ধরনের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে একটি আত্মগ্লানি কাজ করে। জানা বর্তমানে তাবু টানিয়ে তার নানা-নানির সঙ্গে বাস করছে।

জমজ বোনের কথা উল্লেখ করে স্মৃতিকাতর জানা জানায়, যুদ্ধের আগে দুই জমজ বোন সবসময় একই পোশাক পরত এবং একসঙ্গে থাকত। সে বলে, ‘সে শুধু আমার জমজ ছিল না, সে ছিল আমার জীবনের সঙ্গী।’

ফিলিস্তিনের সমাজ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ৬৮ হাজারের বেশি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক তাদের পরিবারের ‘একমাত্র জীবিত সদস্য’ হিসেবে রয়ে গেছেন এবং ৭৫ হাজারের বেশি শিশু তাদের বাবা-মা উভয়কে বা একজনকে হারিয়ে এতিম হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, গাজার চিকিৎসকরা হাসপাতালে একা এবং আহত অবস্থায় আসা রোগীদের চিহ্নিত করতে ডব্লিউসিএনএসএফ (আহত শিশু, যার কোনো পরিবার অবশিষ্ট নেই) পরিভাষা ব্যবহার করছেন।

গাজা সিটির ১৮ বছর বয়সি দিমা জুনিহনাও তাদের একজন।

২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বোমার আঘাতে তাদের পাশের বাড়িটি ধসে তাদের ঘরের ওপর পড়ে। এতে তার বাবা, মা এবং তিন ছোট ভাই নিহত হন। ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি দরজার আড়ালে থাকায় বেঁচে যান দিমা।

মাথায় আঘাত নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দিমা উদ্ধারকারীদের কাছে তার পরিবারকে এনে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছিল। কিন্তু তাকে জানানো হয় সবাই মারা গেছে। দিমা বলে, ‘আমি এমনকি কাঁদতেও পারিনি। এখনো মনে হয় তারা এই বুঝি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়বে।’

দিমা নিজেকে ‘একমাত্র জীবিত সদস্য’ হিসেবে পরিচয় দিতে বা অন্যদের সহানুভূতি পেতে পছন্দ করে না। তবে বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে সে নিজের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে।

এত কষ্টের পরও জানা এবং দিমা দুজনেই তাদের পড়াশোনা শেষ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বর্তমানে সে কোরআনের ৯টি পারা মুখস্থ করেছে। অন্যদিকে, দিমা সম্প্রতি হাই স্কুল শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার কথা ভাবছে।

বিশ্বের কাছে নিজেদের ইচ্ছার কথা জানাতে গিয়ে জানা বলে, ‘আমরা একটি ঘর, একটি স্কুল এবং ভয়হীন বেঁচে থাকার মতো একটি জায়গা চাই। আমাদের শেখার অধিকার আছে, খেলার এবং স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে।’

আর দিমার চাওয়া আরও সাধারণ, ‘আমাকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখুক সবাই। শুধু সেই মেয়েটি হিসেবে নয়, যার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে।’

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন