মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

শিরোনাম

স্নাতক পর্যায়ে ১২ হাজারের বেশি কোর্স বাতিল করল চীন, কেন?

মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল মানুষের কাজের ধরণই বদলে দিচ্ছে না, বরং শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য কোন বিষয় বেছে নেবে তাও নতুন করে নির্ধারণ করছে।

কনসাল্টিং, ফাইন্যান্স, মার্কেটিং এবং ম্যানেজমেন্টের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এআই যেভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করা শুরু করেছে, তাতে শিক্ষার্থীরা এমন সব ডিগ্রিতে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করছে যার ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

গত মাসেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, দ্বিধাগ্রস্ত আবেদনকারীদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এমবিএ প্রোগ্রামের টিউশন ফি কমাতে শুরু করেছে। এবার একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে চীনে, তবে তা আরও অনেক বড় পরিসরে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের একাডেমিক কোর্সগুলোতে বড় ধরনের রদবদল করছে—পুরোনো কোর্সগুলো বাদ দিয়ে সেগুলোর জায়গায় উদীয়মান প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

পুরোনো কোর্স বাতিল করছে চীন

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের একাডেমিক কোর্সগুলোতে একটি বিশাল পুনর্বিন্যাস চালাচ্ছে। অপ্রচলিত বা পুরোনো হয়ে যাওয়া প্রোগ্রামগুলো বাতিল করে উদীয়মান প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন কোর্স চালু করা হচ্ছে।

বেইজিংয়ের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যাতে উচ্চশিক্ষাকে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো আগামী প্রজন্মের শিল্পগুলোতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করা।

এই পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি বড় বাস্তব কারণ রয়েছে: চীনের গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির বাজার বর্তমানে বেশ চাপের মধ্যে আছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অনেকেই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখনো বেশ উচ্চ (১৬ শতাংশের বেশি), অন্যদিকে নিয়োগকর্তারা যেসব দক্ষতা খুঁজছেন, এআই এসে সেগুলোকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

এর ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন সব বিষয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যেগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অতিরিক্ত বেশি অথবা যেগুলো বর্তমান পরিবর্তনশীল অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই কাটছাঁটের বড় অংশটি পড়েছে কলা, মানবিক, বিদেশি ভাষা এবং ম্যানেজমেন্ট-সম্পর্কিত ক্ষেত্রগুলোর ওপর।

চীনের জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে নতুন কোর্স

একই সঙ্গে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন কিছু কোর্স চালু করছে যা সরাসরি চীনের শিল্প খাতের লক্ষ্যগুলোকে সমর্থন করে। এর একটি অন্যতম উদাহরণ হলো ‘এমবডিড ইন্টেলিজেন্স’—এমন একটি ক্ষেত্র যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে রোবটের মতো ভৌত যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করে। বাস্তব অর্থনীতিতে উন্নত এআই প্রযুক্তিকে একীভূত করার সরকারি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অন্তত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়ে নতুন মেজর চালু করেছে।

চীনের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে এভাবে নতুন করে সাজানোর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। প্রতিবেদনটিতে উদ্ধৃত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ১২ হাজার ২০০টি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম বাতিল বা স্থগিত করেছে এবং একই সময়ে ১০ হাজার ২০০টি নতুন প্রোগ্রাম যুক্ত করেছে। সামগ্রিকভাবে, এই সময়ের মধ্যে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৩০ শতাংশেরও বেশি প্রোগ্রাম কোনো না কোনো ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

আরও গভীর সংস্কারের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, কেবল একটি ডিগ্রির বদলে আরেকটি ডিগ্রি নিয়ে আসাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরও গভীর সংস্কার প্রয়োজন। এখন যেসব প্রোগ্রাম বন্ধ করা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই মাত্র কয়েক বছর আগে চালু করা হয়েছিল এবং সেগুলো উন্নত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমাগত নতুন মেজর যুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত একটি আরও নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শিল্পের পরিবর্তনশীল চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কোর্স বেছে নিতে পারবে এবং এমন কিছু দক্ষতা অর্জন করতে পারবে যা প্রযুক্তির বিবর্তনের পরেও প্রাসঙ্গিক থাকবে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন