বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

শিরোনাম

আস্থাভোটে থালাপতির বাজিমাত, আন্না ডিএমকে-তে ভাঙনের সুর

বুধবার, মে ১৩, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা যেন আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন অভিনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া ‘থালাপতি’ বিজয়। বিধানসভায় আস্থাভোটে জয় পেয়ে শুধু নিজের সরকারকেই স্থিতিশীল করলেন না, একই সঙ্গে বিরোধী শিবির আন্না ডিএমকের অন্দরে বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিতও সামনে এনে দিলেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভোটাভুটি দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে আগামী দিনের জোটসমীকরণ ও সংখ্যালঘু রাজনীতির দিকনির্দেশক হয়ে উঠতে পারে।

তামিলনাড়ু বিধানসভায় অনুষ্ঠিত আস্থাভোটে বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তামিলগা ভেট্রি কাঝাগম সরকারের পক্ষে ভোট পড়ে ১১৪টি। বিপক্ষে ভোট দেন ২২ বিধায়ক। ভোটাভুটির সময় দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের ৫৯ বিধায়ক ওয়াকআউট করেন। অন্যদিকে আন্না ডিএমকে-র ৪৭ বিধায়কের বড় অংশ ভোটাভুটিতে অংশ না নিলেও দলের নির্দেশ অমান্য করে ২৫ বিধায়ক সরাসরি বিজয়ের সরকারের পক্ষে ভোট দেন। আর এই ঘটনাই এখন তামিল রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

আস্থাভোটে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। তিনি বলেন, হুইসলের জয় হয়েছে। আমরা নিজেদের সংখ্যালঘু সরকার বলব—এমন সরকার, যারা সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করবে।

উল্লেখ্য, ‘হুইসল’ তার দল তামিলগা ভেট্রি কাঝাগমের নির্বাচনী প্রতীক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে বিজয় একদিকে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক ভোটব্যাংকের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিলেন, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের আলাদা অবস্থানও তুলে ধরলেন।

তবে আস্থাভোটের অঙ্ক আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে আন্না ডিএমকের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে। পালানিস্বামীর নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দলের ভেতরে অসন্তোষের গুঞ্জন ছিল। সেই অসন্তোষ এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সন্মুগম এবং এসপি বেলুমণির মতো নেতারা প্রকাশ্যে দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে বিজয়ের পক্ষে অবস্থান নেন।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বিদ্রোহ যদি আরও গভীর হয়, তাহলে আন্না ডিএমকে কার্যত ছোট আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সূত্রের খবর, বিদ্রোহী বিধায়কদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দলের অন্দরে টানাপোড়েন তুঙ্গে। তারা দলেই থাকবেন, নাকি আলাদা রাজনৈতিক পথ নেবেন—তা নিয়ে এখন জোর জল্পনা। বিদ্রোহীদের বাদ দিলে আন্না ডিএমকের বিধায়ক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তামিলগা ভেট্রি কাঝাগম এককভাবে ১০৫টি আসনে জয় পেয়েছিল। কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ, বিদুথলাই চিরুথাইগাল কাচ্চি এবং অম্মা মাক্কাল মুন্নেত্র কাঝাগম-সহ একাধিক দল বিজয়ের সরকারকে সমর্থন জানায়। সেই সমর্থনের সঙ্গেই আন্না ডিএমকে-র বিদ্রোহী অংশের ভোট যোগ হওয়ায় আস্থাভোটে সহজ জয় নিশ্চিত হয়।

অন্যদিকে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম এই ভোটাভুটিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন বলে দাবি করেছে। ওয়াকআউটের আগে উদয়নিধি স্ট্যালিন বলেন, যারা বিজয়কে ভোট দিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত। ধর্মনিরপেক্ষ সরকারই তামিলনাড়ুর মানুষের চাওয়া।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের ওয়াকআউট কৌশলগত হলেও তা বিজয়ের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকেই আরও বাড়িয়ে দিল। কারণ বিরোধীরা সরাসরি লড়াইয়ে না গিয়ে সংসদীয় সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ায় তামিলগা ভেট্রি কাঝাগম নিজেদের স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম ও আন্না ডিএমকের দ্বিমুখী আধিপত্য ছিল। কিন্তু বিজয়ের উত্থান সেই সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে। চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক মূলধনে পরিণত করে তিনি এখন বাস্তব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। আর আস্থাভোটের ফলাফলের পর স্পষ্ট, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ‘থালাপতি যুগ’ আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেল।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন